বিষ মিশ্রণকারীরা কি অশরীরী প্রেতাত্মা!
প্রকাশ : ৩১ মে ২০১৪, ২২:০৬
কেন শুধু তখনই টনক নড়ে দায়িত্ববানদের, যখন বিষাক্ত ফলমূলে বাজার ছেয়ে যায় এবং ক্ষতি যা হবার তা হয়েই যায়। অর্থাত্ ফল-ক্রেতাদের রক্তে মিশে যায় ঐ মারাত্মক বিষ আর সে বিষের তাত্ক্ষণিক ও সুদূর প্রভাবে, দু’ভাবেই আক্রান্ত হয়ে হতভাগারা সর্বনাশের প্রহর গোনে।
১৬ কোটি বাঙালি-অধ্যুষিত এদেশটি খুব একটা বড় নয়, বরং জনভারে যেন উপচে পড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে দেখলে মনে হয় সে যেন এত বিশাল জনচাপ আর সইতে পারছে না। এদেশটি সত্যিই সুফলা, সারাবছরই এদেশে নানা ধরনের ফলের সমারোহ দেখতে পাওয়া যায় প্রায় সর্বত্র, আর ফল-মৌসুমে তো কথাই নেই। আমার মনে আছে একবার বাউফলের নুরাইনপুর লঞ্চঘাটে আমরা নির্ধারিত একটি লঞ্চে উঠতে পারিনি, কারণ লঞ্চটি সেদিন সে ঘাটেই আসেনি। পরে জেনেছি, চরাঞ্চলে সেবার এত তরমুজ ফলেছে যে এক তরমুজেই লঞ্চ বোঝাই হয়ে গিয়েছিল। এভাবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিলেট, যশোর, খুলনায় আম-জাম-লিচু-কলা-কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদী কলার জন্য বিখ্যাত, বরিশালের নারকেল-সুপারি-পেয়ারা, কলার সুখ্যাতির কথা কে না জানে? এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা জাতের ফল উত্পন্ন হয়, যা ফল-চাষীদের আয়ের একটা বড় উত্স, এতে কোনই সন্দেহ নেই। কিন্তু ফল পচনশীল বলে, তাত্ক্ষণিক বিক্রি করতে না পারলে মুনাফা কম হবে, এই আশংকায় ফলচাষীরা ও ফল-ব্যবসায়ীরা যোগসাজশে যে লোভের এবং লাভের চর্চা করে যাচ্ছে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, কঠোর দণ্ড না দিয়ে কি করে দেখে যাচ্ছে প্রশাসন ও বিবেকবান মানুষ? সুস্থ জনস্বাস্থ্য দেশের স্বার্থ-বিরোধী নয়, বরং অত্যন্ত সহায়ক দেশের চালিকাশক্তির আধার হিসেবে। কিন্তু কি করে তা বজায় রাখা সম্ভব যখন ভেজাল-মুক্ত খাবার পাওয়াই দুষ্কর! বিষাক্ত কীটনাশক যদি খাবারে মিশানো হয়, প্রতিটি ফলে ছিটানো হয়, তাহলে সেগুলো খেয়ে মানব-শরীরের কি অবস্থা হয় তা কি বুঝিয়ে বলতে হয়? ঐ নরকের কীটেরা তাই-ই মিশিয়ে যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যে। তাদের লক্ষ্য একটাই, আর তা হল কিভাবে অধিক মুনাফা করা যায়, মানুষ মরে মরুক, তাতে কিছুই যায় আসে না তাদের।
কিছুদিন আগেও ফল-বাগানগুলো বিষমুক্ত ছিল, কেননা ফল পেড়ে আনার পর আড়তে জমা করে বিষাক্ত কার্বাইড, ফরমালিন ইত্যাদি মিশানো হতো তাতে। এজন্য আড়তে হানা দিলেই হাতেনাতে ধরা পড়ত শয়তানেরা, জব্দ হত বিষাক্ত ফল। জেল-জরিমানা হতো ওদের। কিন্তু এখন আড়তে দিনরাত টহল দিলেও তেমন দৃশ্য খুব একটা চোখে পড়বে না, কারণ ভেজালকারীরা কৌশল পাল্টেছে, শুধু প্রশাসনই আগের জায়গায় রয়ে গেছে জড়বত্। তাই আগের চেয়েও বহুগুণ বেড়ে গেছে বিষাক্ত কার্যক্রম।
এখন সমন্বয় ঘটেছে ফলচাষী ও ফল-ব্যবসায়ীদের মধ্যে, অলিখিত চুক্তিবদ্ধ হয়েছে তারা, যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে পারে অশরীরী প্রেতাত্মার মত। কিন্তু তাতো তারা নয় ,সবাই মনুষ্য-আকৃতির, এমনকি তাদের সরব উপস্থিতিও দৃশ্যমান। তবু কেন যে প্রশাসন দেখতে পাচ্ছে না, ধরতে পারছে না, সেটাই অত্যাশ্চর্য। লোভী অর্থ-পিশাচেরা এখন গাছের গোড়ায় বিষাক্ত সার প্রয়োগ করছে, গাছে অপক্ব ফলে বিষাক্ত কীটনাশক ছিটাচ্ছে, যাতে পোকায় না ধরে, পচে না যায়, আর অবশ্যই অকালে পেকে যায়। আর ফলের চাহিদা তো চিরন্তন, রুগী, সুস্থ সবাই ফলের পিয়াসী, তাই যখন বাজারে পাকা ফলের সমাগম দেখতে পায় হামলে পড়ে, দ্বিগুণ দামে বিষ কিনে খায় সুস্বাস্থ্যের আশায়, রোগ-মুক্তির আশায়। আর এভাবে ভোক্তাদের প্রতারিত করে বিষাক্রান্ত করে লালে লাল হয়ে যায় বদ-ব্যবসায়ীরা। একটুও বিবেকের দংশনে ভোগে না তারা, কণামাত্র মনুষ্যত্ব-বোধ জাগ্রত হয় না তাদের পাষাণ হূদয়ে। কি করে হবে? ওরা মানুষ কি না তাই এখন ভাবতে হচ্ছে, ওরা কি তবে অশরীরী প্রেতাত্মা! যাদের প্রশাসন দেখতেই পাচ্ছে না। শুধু তাদের বিষ-মেশানো ফল দেখে রাগে-অনুরাগে বাজারময় ঘুরপাক খাচ্ছে, আর তা দেখে আড়ালে বসে শয়তানের হাসি হাসছে মুনাফালোভী প্রেতাত্মারা।
লেখক:প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা
বাউফল কলেজ,বাউফল,পটুয়াখালী
shikha231960@yahoo.com