একজন দিলুয়ারা

ভাওয়ালগড়ের আশীর্বাদে ভরপুর,শিল্পাচার্য জয়নল আবেদীনের স্মৃতিবিজড়িত সবুজ শ্যামল ময়মনসিংহে বেড়ে ওঠা দেলুয়ারা বেগমের। জীবনের শুরুটা মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ে এবং পরবর্তী সময়ে মুমিনুননিসা মহিলা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষালাভ। ১৯৯০ সালের ২৩ ডিসেম্বর তার বিয়ে হয়। স্বামী সরকারি চাকরিজীবী। তার সাথে চলে আসেন ঢাকায়। সাত বছরের সংসারে দুই সন্তানের জননী। সংসারে বেড়ে যায় চাহিদা কিন্তু স্বামীর সীমিত আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যান। অনেক ভেবেও কোনও কূল-কিনারা করতে পারে না দেলুয়ারা বেগম। কেবলই খুঁজতে থাকেন কিছু একটা করা দরকার যাতে করে স্বামীর আয়ের পাশাপাশি তার একটু বাড়তি আয়-স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে পারেন তার সংসারে। তার এই ভাবনা জানান তার স্বামীকে এবং স্বামীর সাথে আলাপ করেই তিনি ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রশিক্ষণ নেন হস্তশিল্প ও বুটিকের। ২০০০ সালে স্বামীর বদলি চাকরির সূত্রে চলে আসেন জামালপুরে। এখানে তিনি তার মতোই আরো অনেক নারীকে সেলাই, কাপড় কাটা, পোশাক তৈরি, ডিজাইন, রং করা, বাটিক ও বুটিকের প্রশিক্ষণ দেন। তিনি ক্রমেই অন্য নারীর মাঝে নিজেকে একজন সফল নারীর উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন এবং শহরেও তার একটি পরিচিতি গড়ে উঠে। ২০০৫ সালে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা সম্বল করে এবং তার সাথে আরো ২০ জন নারীকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন তার স্বপ্নের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দীপ্ত কুটির। ধীরে ধীরে তার প্রতিষ্ঠানের প্রচার বাড়তে থাকে কেননা তার সবচেয়ে বড় মূলধন ছিলো তার সততা ও নিষ্ঠা। শুরু থেকেই তিনি তার তৈরি করা পোশাকের গুণগত মানের ব্যাপারে কোনও আপোষ করেননি। সেইসাথে দামের ব্যাপারেও তিনি নিজের লাভের চাইতে ক্রেতার সাধ্যের ব্যাপারটা মাথায় রাখেন। তবে এই পুরো সময়টা তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন বন্ধুর পথ। কিন্তু তিনি ভেঙ্গে পড়েননি বা দমে যাননি। মন শক্ত করে এগিয়ে গেছেন সামনে। একপর্যায়ে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা সিসি লোন নেন। এই টাকাটা তিনি তার ব্যবসায় খাটান এবং খুব দ্রুত তার ব্যবসার প্রসার ঘটান। ন্যাশনাল ব্যাংক তার এই অগ্রগতি লক্ষ্য করে এবং তার ব্যবসার আরো বিস্তার ও পরিধি ঘটানোর লক্ষ্যে ২০০৯ সালে তাকে ১৫ লাখ টাকা এস.এম.ই লোন দেয়। একসময় নিজে অর্থকষ্টে ভুগেছেন বলেই হয়তো আর্ত, দরিদ্র ,অসহায় নারীদের জন্য তার মনে রয়েছে অসীম মমত্ববোধ। তিনি বেকার, অসহায় আরো অনেক নারীকে তার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ট্রেনিং দিয়ে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলেন। এর মধ্যেই তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পান বেশ কিছু সম্মাননা যা তাকে আরো অনুপ্রাণিত করে। বর্তমানে ঢাকাইয়া পট্টির মাদ্রাসা রোডে দশ রুমবিশিষ্ট তার তিনতলা একটি ভাড়া বাড়িতে কারখানা ও শোরুম। যেখানে তিনি ঢাকার বিভিন্ন শোরুমে তার এবং তার প্রতিষ্ঠানের নারীদের তৈরি করা পণ্য সরবরাহ করেন। তার এসব কাজে তাকে তার বড়ভাইয়ের ছেলে গোলাম হাবিবুল্লাহ সওদাগর সহযোগিতা করেন। তার ভবিষ্যত্ স্বপ্ন তার কেনা একখণ্ড জমিতে তিনি তার দীপ্ত কুটিরকে আরো বড় করে গড়ে তুলবেন। যেখানে দীপ্ত কুটিরই তার মতো আরো হাজার হাজার দীপ্তময়ীর স্বপ্ন পূরণে অবদান রাখবে।