ভালোবাসা বনাম ইটের ঘা
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৪, ২১:৫৫
মেয়েটির অপরাধ সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল তার পছন্দের পুরুষটিকে। কিন্তু ভালোবাসা-টাসা বলে কিছু আছে বলে বিশ্বাস করেন না তার পিতা ও ভাইয়েরা। তাদের দাবি, যার সঙ্গে তারা বিয়ে দেবেন তার সঙ্গে বাস করতে হবে সারাজীবন। কিন্তু মেয়েটি ধরে নেয় পছন্দের পুরুষটি ছাড়া তার জীবন চলবে না। সুখী হতে পারবে না। তাই পরিবারের অগোচরে সে বিয়ে করে প্রেমিককে। এরপর ঘর ছেড়ে চলে যায় তার কাছে। এসব ক্ষেত্রে পরিবার সচরাচর যা করে থাকে, এরাও তাই করলেন। প্রেমিকের বিরুদ্ধে মেয়েকে অপহরণের মামলা দিলেন। মামলার বিচার চলছিল।কিন্তু আদালতের রায়ের অপেক্ষা করেনি মেয়েটির পরিবার। মামলার রায় বের হবার আগেই স্বামীর সামনে তার মৃত্যুদণ্ড ‘কার্যকর’ করে ফেলে তারা। একেবারে প্রকাশ্য দিবালোকে। কোর্টের বাইরে। আর মেয়েটির সঙ্গে একই পরিণতি ভোগ করেছে তার গর্ভে থাকা তিন মাসের সন্তানও।
ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তানে গত সপ্তাহে। ঘটনার শিকার ২৫ বছর বয়সী তরুণী ফারজানা। ঘটনাটি বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। গত মঙ্গলবার সারাবিশ্বের মিডিয়ায় এটি ছিল অন্যতম খবর। এই বর্বরতার খবর পৌঁছে গেছে মার্কিন মুলুকেও। হোয়াইট হাউস কঠোর নিন্দা জানিয়েছে এই ঘটনায়। এই কর্মকাণ্ডকে ঘৃন্য, অগ্রহণযোগ্য এবং নারীর প্রতি অবমাননা বলে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, অপরাধীদের কঠোর সাজা না দিলে পাকিস্তানে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হবে না।
নিন্দা জানিয়েছে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিশ্বের অগণিত মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠন। তারা বলেছে, পরিবারের অমতে বিয়ে করলে পাকিস্তানে নিজের সন্তানকে হত্যা করা একটা অসুখের মতো হয়ে গেছে। নরেন্দ্র মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সবেমাত্র ফিরেছিলেন দেশে। কিন্তু ভারত থেকে সুন্দর ‘মুড’ নিয়ে দেশে ফিরেই তাকে এই জঘন্য খবরের মুখোমুখি হতে হলো। তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন, একটা অপরাধীও যেন পার না পায়।
এবার জানা যাক কি ঘটেছিল সেদিন। বাবার দায়ের করা অপহরণ মামলায় হাজিরা দেয়ার দিন ছিল গত মঙ্গলবার। ওই দিন বিকেলে ফারজানা ও তার স্বামী মোহাম্মদ ইকবাল রাস্তায় দাঁড়িয়ে আদালত খোলার জন্য অপেক্ষা করছিল। এমন সময় ফারজানার পরিবারের প্রায় ২০ জন সদস্য তাকে ও তার স্বামীকে আক্রমণ করে। প্রথমে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা। পরে ইট-পাথরের খণ্ড নিয়ে সম্মিলিত হামলা। পালাতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে মেয়েটি। এরপর তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবা-ভাইসহ তার অন্য স্বজনরা। শুরু হয় মেয়েটির উপর পাথরবৃষ্টি। ফারজানাকে সবচেয়ে বেশিবার আঘাত করে তার বাবা। অন্তঃসত্ত্বা ফারজানার পেটে উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকে তার ভাইয়েরা।
একজন নারীকে রাস্তায় ফেলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে চলে আসে অসংখ্য ‘দর্শক’। তারা দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে এই তরুণীর সমস্ত শরীরকে পাথরের আঘাতে থেঁতলে দিয়ে রক্ত বের করার দৃশ্য। যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খাওয়ার দৃশ্য। যাদের হাতে মাল্টিমিডিয়া মোবাইল ফোন ছিল তারা এমন একটা ‘সুযোগ’ মিস করতে রাজি ছিল না। তাই শুরু করে ভিডিও করা। কেবল মানুষ দর্শক নয়। এসেছিল পুলিশ দর্শকও! আদালতের বাইরে হৈ-হল্লা মারামারি শুনে ছুটে এলো পুলিশের দল। তারা এসে দেখে একটি মেয়েকে রাস্তায় ফেলে মারছে একদল মানুষ। পুলিশ জানতে পারল মেয়েটি ভালোবেসে বিয়ে করেছে তাই ‘মৃত্যুদণ্ড’ দিচ্ছে বাবা-মা। এরপর আর পুলিশ এগোতে সাহস পায়নি। ভালোবাসার বিয়ের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অভিযোগে যদি তালেবানের ‘হিটলিস্টে’ তাদের নাম উঠে যায়! তাই তারাও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মেয়েটির লাশ নিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফারজানার স্বামী পুলিশের হাতে-পায়ে ধরেও তাদের মন গলাতে পারেনি। সেখানে উপস্থিত পুলিশের সিনিয়র অফিসার সাফ বলে দেন মেয়েটিকে বাঁচানো তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তাদের দায়িত্ব ‘আইন-শৃঙ্খলা’ রক্ষা করা। ফারজানার বাবা তার কন্যাকে হত্যার কথা স্বীকার করে দাবি করেছেন, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্যই ফারজানাকে হত্যা করা হয়েছে। এই হামলায় ফারজানার দুই ভাই ও তার এক ভাইপোও জড়িত ছিল। ওই ভাইপোর সঙ্গে ফারজানাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার বাবা।
প্রেমিকেও ‘ভেজাল’
ইকবালকে ভালোবেসে বিয়ে করে মৃত্যুকে বরণ করল ফারজানা। কিন্তু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আরো একটি লোমহর্ষক খবর প্রকাশিত হয়েছে। তা হলো, ফারজানার স্বামী ইকবাল তার আগের স্ত্রীকে খুন করেছিলেন! আর চার বছর আগে এই হত্যাকাণ্ড তিনি ঘটিয়েছিলেন ফারজানার সঙ্গে বিয়ের রাস্তা ‘পরিষ্কার’ করার জন্য। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পাকিস্তানে নারীদের জীবনের মূল্য যে কত ঠুনকো তা এই ঘটনার মাধ্যমে পরিষ্কার। বড় ছেলে আওরঙ্গজেব বলেন, তারা বাবা ২০০৯ সালে তাদের মাকে খুন করেন। এই ঘটনায় বাবা গ্রেফতার হয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেরা পরে বাবাকে ক্ষমা করে দিয়ে মামলা তুলে নেয়। ছাড়া পেয়ে যান ইকবাল। পরে তিনি তার ভালোবাসার মানুষ ফারজানাকে বিয়ে করেন। একটি বার্তা সংস্থার পক্ষ থেকে ইকবালকে ফোন দিয়ে আগের স্ত্রীকে হত্যার কথা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কাঁদতে কাঁদতে জবাব দেন, পরের স্ত্রী মারা যাবার কষ্টে তার এখন কথা বলার মতো পরিস্থিতি নেই। আগের স্ত্রীর কথা তার মনে নেই!