[ বা জে ট ]

বাজেট অধিবেশন প্রাণবন্ত হোক

দশম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হবে আগামী ৩ জুন এবং সম্ভবত ৭ জুন ২০১৪-২০১৫ আর্থিক বছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী। এবারও সম্ভবত ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে বাজেট সংসদে পেশ করা হবে। যদিও বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপনাকে সাধারণ মানুষ নেহাত্ই গতানুগতিক বলেই মনে করে, কিন্তু এবারের বাজেটের কয়েকটি প্রেক্ষাপট হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তুমুল বিতর্কের অধিক্ষেত্র। তবে সংসদে বিতর্ক হবে না, ঝড় উঠতে পারে গণমাধ্যমে, সুশীল সমাজ ও জনগণের মনে। যেহেতু জাতীয় সংসদে সত্যিকার অর্থে বিতর্ক করার মতো এমন শক্তিশালী বিরোধী দল নেই, তাই বাজেট আলোচনা জাতীয় সংসদে তেমনটা প্রাণবন্ত না হলেও জনগণ অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। সংসদের অধিবেশনে কেমন বির্তক হলো তা বড় কথা নয়, দেশবাসী ও অর্থনীতিবিদরা যে অভিজ্ঞানটি প্রত্যাশা করে, তা হচ্ছে, বাজেট হতে হবে দেশের অগ্রগতির দিকদর্শন এবং সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের বার্তা থাকতে হবে বাজেটের মধ্যে সন্নিবেশিত। সরকার বলছে, দেশে মাথাপিছু আয় বেড়ে হয়েছে ১১৯০ মার্কিন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, দেশের অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, বেকারত্ব কমেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু জনগণ বলছে এতো স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে কেন? খাদ্যে ভেজাল এমন বেড়েছে কেন ? পরিবহন ব্যবস্থা বা নদীপথে মানুষ মরছে কেন, গুম,খুন বাড়ছে কেন ? বাজেটে এসবের জবাব মিলবে কি ? সংসদে আলোচনা না হলেও মানুষের মনে প্রশ্ন থাকছে। বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা হচ্ছে মূলত কয়েকটি বিষয়কে ঘিরে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ভোগ্যপণ্যের মূল্য কমবে কি? বাড়ি ভাড়া কতটা বাড়বে ? গ্যাস, বিদ্যুত্, পানির মূল্য কতটা বাড়বে? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার অগ্রগতি হবে কিনা। অনেকের ধারণা যেভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে, শিক্ষানবিস চিকিত্সকরা সাংবাদিক আক্রমণ করছে বা কর্মবিরতির আশ্রয় নিয়ে অসুস্থ ব্যক্তিদের জীবন দুর্বিষহ করছে, তাতে মনে হয় অতিরিক্ত বাজেট বরাদ্দ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে অর্থহীন এবং অর্থের অপচয় ভিন্ন অন্য কিছু নয়। অর্থমন্ত্রী বলছেন- এবার আর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে না। কালো টাকার প্রভাবে অর্থনীতিতে শুদ্ধাচার বিপর্যয়ের সন্মুখীন হয়, একথাটি তিনি অনুভব করেছেন। অবশ্যই তিনি জানেন কালো টাকার পরিমাণ যদি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হয় তখন বুঝতে হবে অর্থনীতি কালোবাজারীদের হাতে। দেশবাসী বারবার জানতে চাইছে এতোসব কালো টাকা কিভাবে সৃষ্টি হয়। কালো টাকার উত্পাদন ও উপভোগ এর সাথে সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাঙ্কের প্রশাসকমন্ডলী এবং রাজনীতির চেনা মানুষগুলো কতোটা সম্পৃক্ত? অতীতে কারা কালো টাকা সাদা করেছে, লোকগুলো কারা, যারা শুধু কালো টাকার পিছনে ছুটে বেড়ান, অনুগ্রহ করে অর্থমন্ত্রী এসব কালোবিড়াল সম্পর্কে ইঙ্গিত দিবেন কি? এ প্রশ্নের জবাব হবে স্বচ্ছতার নিদর্শন। বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের প্রভাব অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণে কতোটা কঠোর হবে এ জাতীয় কথা আসতে পারে। ব্যাঙ্কিং খাত নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃশ্যমান হতে হবে। তারপরও কি জাতীয় মূল্যায়ন সূচকের বিবেচনায় নতুন নতুন ব্যাঙ্ক অনুমোদন দেয়া হচ্ছে এবং তাতে সরকারের স্বচ্ছতা আছে কিনা এসব প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসতে পারে। বাজেট বক্তৃতায় এসব নিয়ে নীরব থাকা চলবে না। উত্তর না দিলেও দিক নির্দেশনা দিতে হবে। একটি উদীয়মান ও গতিশীল অর্থনৈতিক বিবর্তনকে জবাবদিহিতার মাধ্যমেই দৃশ্যমান করার সুযোগ থেকে দেশবাসীকে বঞ্চিত করা সঠিক হবে না । আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ হবে ৭৯ হাজার ৩১ কোটি টাকা। গতবারের এডিপি পরিমাণ থেকে ১৭ শতাংশ বেশি এবং যার মধ্যে সরকার দিবে ৬৫ শতাংশ। সরকারের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, ভালো কথা। পদ্মাসেতুর জন্যে এডিপিতে ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রামের চার লেনের কাজ দ্রুত শেষ হবে। কিন্তু বিশ্বব্যাঙ্ক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক, জাইকা বা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাঙ্ক কেন পদ্মাসেতুর অর্থায়ন থেকে দূরে সরে গেল তার সঠিক উত্তর কি সরকার কোনদিন দিবে না। হলমার্ক গ্রুপের ২ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অর্থ উদ্ধার করতে আরও ঋণ দিতে হবে কি? সোনালী ব্যাঙ্কের ক্লাসিফাইড লোনের পরিমাণ কত হাজার কোটি টাকা ? ব্যাঙ্কসমূহ বছরান্তে পুনঃতফসিল করে কিভাবে প্রতারণা করছে, এসব প্রশ্ন হয়ত সংসদে আসবে না, কিন্তু জনগণের জিজ্ঞাসার উত্তর কি কোনদিন মিলবে না? ডেসটিনি গ্রুপ কত টাকা পাচার করেছে বা কি অপকর্ম করেছে এনিয়ে অনেক প্রশ্ন বিরাজমান। কিন্তু তার মীমাংসা হতে না হতেই সরকার আবার নতুন করে প্রায় ৪টি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং কোম্পানীকে লাইসেন্স দিচ্ছে কেন? এসব অর্থনৈতিক ভাবনা ছাড়াও যে বিষয়টি অনেক বিতর্ক সৃষ্টি করবে বলে মনে করি, তাহচ্ছে নারায়ণগঞ্জে ৭ খুন, ফেনীতে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারা এবং লক্ষ্মীপুরকে মৃত্যুকূপে পরিণত করা। গুম, খুন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। জনগণের মনে সরকার এবং প্রশাসনের নিদারুণ দুর্বলতা নিয়ে নানান কথা হচ্ছে এবং সরকারের প্রকাশ্য দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ দেখে দেশবাসী হতভম্ব হয়ে পড়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতের দুর্নীতি চিত্র প্রকাশ্যে তুলে ধরছে। তবে দেশ কি অন্ধকার গলিতে প্রবেশ করছে, যেখান থেকে বের হবার পথ পাবে না? খাস জমি বিতরণের অঙ্গনে অনেক বঞ্চনা ও প্রতারণার গল্প আমরা শুনতে পাই। ভূমিহীন চাষী খাস জমি অধিকারে রাখতে পারছে না। দেশে এখন মোনাজাতউদ্দিনের মতো সাংবাদিক নেই, কার কাছে শুনবো এসকল চাষী ও ক্ষেত-মজুরের প্রবঞ্চনার করুণ আর্তনাদের কাহিনী। তবে পত্র-পত্রিকা একেবারে নীরব নয়, কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট দ্প্তরকে তা শুনতে হবে এবং বুঝতে হবে। যারা জনতার কণ্ঠ শুনতে পাবে না তারা অবশ্যই একদিন বিলীন হয়ে যাবে। অর্পিত সম্পত্তি আইনের মধ্যে এমন সব জটিলতার সৃষ্টি করা হয়েছে যা সত্যি কথা বলতে কি হিন্দুদের বাড়িঘর আগুন লাগানোর একটি কারণ সৃষ্টি করেছে। এ জাতীয় বালখিল্য বা চপল রাজনীতির লক্ষ্য কি ? অবশ্যই ভয়াবহ। আগুন নিয়ে খেলা ভালো নয়। অনেকদিন থেকে দেশে ৭টি অর্থনৈতিক জোন করার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কোন লক্ষণ নেই। হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পকে অন্যত্র সরাতে হবে, সিদ্ধান্ত হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হচ্ছে না কেন? সরকার সমপ্রতি বলেছে চামড়া শিল্পপতিদেরকে এজন্য সরকার কয়েক হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তা দিবে, কিন্তু তাদের দাবি অনেক । এ সমস্যার সমাধান করতে হবে। আদমজী এলাকায় তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থান দিয়ে এবং সেখানে পোশাক শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের আবাসনের সুযোগ করলে নতুন এক দিগন্তের স্থায়ী রূপ নিতে পারে। জানা যায় মুন্সিগঞ্জে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হচ্ছে, তার বন্টন নীতিমালা কি হবে, এ নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। জবাব দিতে হবে এখনই, গোপন করা চলবে না। দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। অর্থনীতিবিদরা উত্কণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। খেয়াল রাখতে হবে, বিনিয়োগকারীদের কাছে মুনাফার হার কম-বেশি ছাড়াও, আকর্ষণীয় ও লোভনীয় হচ্ছে দেশ-কাল-পাত্র, যেখানে আইনের শাসন থাকবে সুপ্রতিষ্ঠিত, দুর্বৃত্তায়ন হবে বিবর্জিত, সরকার ও জনগণের মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকবে পরিচ্ছন্ন। এর অর্থ হচ্ছে সরকারকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, জনগণ ভীত, বিব্রত এবং দিশেহারা হয়ে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় এব্যাপারে কঠোর ভাষ্া ব্যবহার করুন। আপনি এদেশের জনপ্রশাসনের প্রবীণ এবং স্বনামধন্য ব্যক্তি, আপনার ভয় নেই। কিছু বলুন, জনগণ শুনতে চায়। ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র যাই হোক না কেন, সবার উপরে হচ্ছে দেশজ উত্পাদন বৃদ্ধি ও স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বিদেশি সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করতে না পারলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব হবে না। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানাবিধ সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিবে। তাই বিনিয়োগের বিকল্প কোন পন্থা নেই। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হলে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সূত্র ও সংকেতের সূচনা করতে হবে যা বিনিয়োগকে অতিদ্রুত আকর্ষণ করতে পারবে। সুশাসন হচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক অঙ্গনে এক মৌলিক বার্তা। অর্থনৈতিক সুষ্ঠ ুনীতিমালা হচ্ছে দর্শন বা অগ্রগতির পদ্ধতি। কিন্তু সুশাসন না হলে কোন বার্তাই প্রয়োগধর্মী হবে না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে জনগণের তাই প্রত্যাশার শেষ নেই। এবাবের বাজেটে অধিক গুরুত্ব হচ্ছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। সংসদে এসব কথা আলোচনা না হতে পারে কিন্তু কখন কে গুম বা খুন হবে এ ভীতি কি কোন দেশকে সামনে নিতে পারবে? অবশ্যই নয়। বাজেট অধিবেশনে এসব আলোচনা কেমন হবে জানি না, তবে জনগণের মনে অনেক প্রশ্ন যার উত্তর হয়তো কোনদিন মিলবে না। লেখক: সাবেক সচিব।