বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের ৩ যুদ্ধজাহাজ

বঙ্গোপসাগরে নিজেদের জলসীমায় তিনটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছে মিয়ানমার। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে বিজিবি সদস্য নিহতের ঘটনার পর এসব যুদ্ধজাহাজ টহল দিচ্ছে বলে জানিয়েছে বঙ্গোপসাগর থেকে ফিরে আসা বাংলাদেশি জেলেরা। মিয়ানমারের মংডুর নিকটবর্তী এলাকায় দুটি ও কিলা দং এলাকায় একটি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সূত্রে জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমারের জলসীমায় সে দেশের তিন যুদ্ধ জাহাজের টহলের ব্যাপারে নৌবাহিনীও সজাগ রয়েছে। বাংলাদেশের জলসীমায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের নিয়মিত টহল রয়েছে। এদিকে মিয়ানমার নৌবাহিনী আকিয়াব বন্দর থেকে বাংলাদেশের পণ্যবাহী ট্রলার আসা বন্ধ করে দিয়েছে। গতকাল সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টেকনাফ স্থল বন্দরে মিয়ানমার থেকে কোন পণ্যবাহী ট্রলার আসেনি। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধশত ট্রলার পণ্য নিয়ে এখন আকিয়াব বন্দরে আটকে পড়েছে। কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লে. কাজি হারুন উর রশিদ বলেন, মিয়ানমারের জলসীমায় তাদের নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ টহল দিচ্ছে বলে শুনেছি। আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। এ কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে যাত্রীবাহী জাহাজ ও ট্রলারগুলোকে আমাদের নির্দেশনা মেনে চলাচল করতে বলা হয়েছে। সেন্টমার্টিনের কয়েকজন স্থানীয় জেলে জানান, গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে দ্বীপের পূর্ব দিকে ট্রলার নিয়ে মাছ শিকারে গেলে মিয়ানমার জলসীমায় সে দেশের নৌবাহিনীর তিনটি যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করতে দেখা গেছে। গতকাল রবিবার বেলা ১২টার দিকে টেকনাফ স্থলবন্দরে গিয়ে দেখা যায়, মিয়ানমার থেকে কোন ধরনের পণ্যবাহী ট্রলার বন্দরে আসেনি। স্থলবন্দরের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) গুলিবর্ষণ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে হত্যা করার ঘটনায় দু দেশের সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা নুরে আলম বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের পর টেকনাফ স্থলবন্দরে মিয়ানমার আকিয়াব বন্দর দিয়ে শুক্রবার থেকে গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কোন পণ্যবাহী ট্রলার আসেনি। বিজিবি সদস্যের লাশ নাইক্ষ্যংছড়িতে বান্দরবান প্রতিনিধি মিলন চক্রবর্তী ও উখিয়া সংবাদদাতা রফিক উদ্দিন বাবুল জানান, বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে পাইনছড়ি ক্যাম্প কমান্ডার নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানের লাশ গতকাল নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবি ব্যাটালিয়ান সদর দফতরে আনা হয়। দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে লেম্বুছড়ি ক্যাম্প থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশ ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে আনা হয়। পরে লাশ ময়না তদন্তের জন্য কক্সবাজার হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। আজ সোমবার নাইক্ষ্যংছড়িতে বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে জানাজা শেষে মিজানের লাশ তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বারের মোহনপুর ইউনিয়নের ভেলানগর পাঠানো হবে। সীমান্তে উত্তেজনা এখনো কমেনি মিয়ানমারের বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ) ও সেনাবাহিনী এখনো রণসজ্জিত অবস্থায় টহল দিচ্ছে সীমান্তে। বিশেষ করে সেনাবাহিনী মিয়ানমারের বিওপিগুলোতে ভারি অস্ত্র স্থাপন করেছে। সেনাবাহিনীর গাড়ি দিয়ে এক বিওপি থেকে আরেক বিওপিতে টহল দিতে দেখা গেছে। বিজিবি গোপন সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়েছে যে, মিয়ানমারের বিওপিগুলোতে বিজিপি মেশিনগান স্থাপন করে বাংলাদেশের সীমান্তের দিকে তাক করে রয়েছে। তবে মিয়ানমারের বিজিপি ও সেনাবাহিনীর এসব রণসজ্জার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বিজিবি তাদের পাল্টা প্রতিরোধ ও প্রতিবাদ জানানোর জন্য পর্যাপ্ত শক্তি বৃদ্ধি করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিজিবি’র কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খন্দকার ফরিদ হাসান। এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রি. জে. সৈয়দ আহমদ আলী বলেন, প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক বজায় রাখতে চাই। কিন্তু তারা যদি সেটার গুরুত্ব না বুঝে উল্টো ঘায়েল করার চেষ্টা করে তার পাল্টা জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছে। সীমান্তের নিরাপত্তায় বিজিবি প্রস্তুত রয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে নিহত মিজানুর রহমানের পরিবারকে ৫ লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। শোকে নির্বাক মিজানের পরিবার চান্দিনা ও বুড়িচং (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, মিজানুর রহমানের মৃত্যুর খবরে তার পরিবারের সদস্যরা এখন নির্বাক প্রায়। গতকাল বিকালে মিজানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী শামীমা শোকে পাথর হয়ে আছেন। মা ফাতেমা একের পর এক জনকে জড়িয়ে ধরে বলছেন ‘আমার মিজান আইব নি, কোন সময় তারে আনব....’। বড় মেয়ে ফাতেমা (১৬), হালিমা (১৪), শিমু (১৩) চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না কনিষ্ঠ কন্যা হাবিবা (৪)।