রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব অর্থনীতিতে
প্রকাশ : ০১ জুন ২০১৪, ২৩:১০
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগসহ গোটা অর্থনীতিতে। সমঝোতামূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভাবে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি কমে যাচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রযাত্রাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর অবকাঠামোগত সমস্যাসহ নানা কারণে বিনিয়োগের সুযোগ কমায় টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সিপিডি’র ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৩-১৪ তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, গবেষক ফারজানা সেহরীন প্রমুখ।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা ও প্রকৃত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে পার্থক্য বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের মধ্যে আটকে গেছে। কিন্তু মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে ৮, ৯ ও ১০ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ও কার্যকরভাবে মধ্য আয়ের দেশে পৌঁছাতে হলে একটি টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া সরকারের ব্যয়কে সঠিকভাবে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যয়ের অপচয় বন্ধ করতে হবে। সমঝোতামূলক রাজনীতির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করতে হবে।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি বাজেটে বড় অঙ্কের আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের প্রবণতা বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে ফেলে। তাই পরাবাস্তব বাজেট না করে বাস্তবতার নিরিখে বাজেট করা প্রয়োজন। রাজস্ব আয়-ব্যয় কাঠামো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০৯ অর্থবছরের পর এ বছরই প্রথম এনবিআর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়েছে। ব্যয় মেটাতে সরকারকে ঋণ করতে হচ্ছে। এদিকে ঘাটতির পরিমাণ জিডিপি’র তুলনায় কম হলেও ঘাটতি অর্থায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গ্যাস, বিদ্যুত্ ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও সাশ্রয়ী হচ্ছে না। উন্নয়ন ব্যয় (মূল্যস্ফীতির বাইরে) বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি কাজে অনেক বিলম্ব হচ্ছে। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়লেও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা উত্সাহিত হচ্ছেন না। ড. মোস্তাফিজ আরও বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতি বাড়াতে যেখানে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন ব্যয় প্রয়োজন। সেখানে পাইপালাইনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আটকে থাকা খুবই দুঃখজনক। তাই বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা অর্জন করা দরকার। যেন বিদেশি প্রতিশ্রুত তহবিলগুলো সঠিকভাবে ছাড় করা যায়। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের বিদেশি অনুদানের তুলনায় ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়েও সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে তুলনামূলকভাবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি। উত্পাদক ও কৃষক পর্যায়ে পণ্যের দাম খুব কম হলেও ভোক্তা পর্যায়ে দাম অনেক বেশি। এ ধরনের প্রবণতা অর্থনীতির জন্য খুব নেতিবাচক। তবে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। সুসংহত রিজার্ভ স্বস্তির কারণ হলেও বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে ডলার কেনায় মূল্যস্ফীতির উপর কিছুটা চাপ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং সেক্টরে কু-ঋণ বাড়ছে। বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ। এর প্রভাব পড়ছে ভালো ঋণ গ্রহীতার উপরও। ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ হার কমাচ্ছে না। ফলে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। অলস টাকা পড়ে থাকার পরও স্প্রেড (আমানত ও ঋণের সুদ হারের পার্থক্য) কমছে না। বেসরকারি উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে ঋণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। এ ধরনের পরিস্থিতি ব্যাংকিং সেক্টরের জন্য আগাম সতর্কবাণী।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা সুযোগ তৈরি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না উল্লেখ করে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চীন থেকে অনেক বিনিয়োগকারী বিনিয়োগ স্থানান্তর করতে চাইছেন। তাছাড়া বিশ্ববাজারে পোশাক ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ তার সঠিক ব্যবহার করতে পারছে না। দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য প্রসারে জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্যে এ দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশ সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারলে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ ও বাজার বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে।
এদিকে আমদানি ব্যয় নাগালের মধ্যে থাকলেও যেসব পণ্য আমদানিতে শূন্য শুল্ক বা খুব কম শুল্ক বিদ্যমান এসব পণ্যের আমদানি হঠাত্ করে বেড়ে গেছে। এর মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে কি-না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাচার সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতি বছর ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংসহ নানা উপায়ে দেড় বিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। পাচার বন্ধ করতে আমদানি পণ্যের যথাযথ তদারকি করা প্রয়োজন।
বিদ্যুত্ প্রসঙ্গে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিদ্যুত্ উত্পাদনে সক্ষমতা বাড়লেও প্রকৃত উত্পাদন হচ্ছে কম। তাছাড়া কুইক রেন্টাল থেকে সরকার পূর্বের উচ্চ মূল্যেই ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুত্ কেনার চুক্তি নবায়ন করছে। অথচ এখন স্থির খরচ না থাকায় কম মূল্যে বিদ্যুত্ কেনাই ছিল কাম্য। সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুত্ কেনার ব্যাপারে সরকারের নজর দেয়া প্রয়োজন।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে অনেক ছোট ছোট গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। চামড়া খাত বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। এ খাতের উন্নয়নে প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে।