অপ্রদর্শিত টাকা নিয়ে বাস্তব কথা

গত ০৯/০৫/২০১৪ তারিখে পত্র-পত্রিকায় দেখলাম রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেল আয়োজিত বাজেট বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সভায় মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত উল্লেখ করেন যে আগামী বাজেটে (২০১৪-১৫) কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এ কথাটি জেনে যত না সন্তুষ্ট হয়েছি, তার চেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছি। কেননা অর্থনীতির স্বাভাবিক প্যারামিটারের আওতায় চলমান মিথস্ক্রিয়াভুক্ত কালো টাকা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, আমরা যে কালো টাকা (Black Money) বলি, আসলে কি কালো? না, তা কিন্তু নয়। কারণ সাদা-কালো উভয়ই মানি সার্কুলেশনের আওতাভুক্ত। এটি সরকারের হিসাবের মধ্যে থাকে না, বিশৃঙ্খল গতিতে চলতে থাকে এবং আর্থ-সামাজিক পথের মধ্যে কর্কট রোগের মতো ক্ষতের সৃষ্টি করে, যা প্রকারান্তরে ব্যষ্টিক (Micro) ও সামষ্টিক (Macro) অর্থনীতিতে অবক্ষয়ের সরণি প্রশস্ত করে। হয়তো অনেকে মনে করতে পারেন, সাদা টাকার ক্রয়ক্ষমতা কালো টাকার চেয়ে বেশি, সেটি ঠিক নয়। কেননা কালো টাকা ও সাদা টাকার ওভিআই (OVI)সহ গঠন প্রণালী একই, তবে কালোর টাকার উত্স স্বচ্ছ নয় এবং তাছাড়া উত্স জানা থাকলেও, অর্জন বিধিসম্মত ও আইনসিদ্ধ নয়। অর্থনৈতিক দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে কালো টাকাকে বিভিন্ন নামে সংজ্ঞায়িত করা হয়। যেমন- ধূসর (Gray), নিমজ্জিত (Submerged), অনানুষ্ঠানিক (Informal), সুপ্ত (Dormant) এবং সর্বোপরি সমান্তরাল (Parallel)। কালো টাকার মূল উত্স অনৈতিক, যেমন- ঘুষ, স্বর্ণ চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসায়, জমি কেনা-বেচার দালালী, মাদক ব্যবসায়, নীলছবি, মানুষ পাচার, চাঁদাবাজি, গুমজনিত আয় ইত্যাদি। আর এটি সঙ্গতকারণেই প্রকারান্তরে শুল্ক, আয়কর, ভ্যাট ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা সৃষ্টি করে। কেননা এতে এক বিশেষ পন্থায় গোপনীয় অপবুদ্ধির আওতায় এগুতে হয়। অবশ্য এই কালো টাকা দেশের চলমান আইন ফাঁকি দিয়ে চোখের আড়ালে বিভিন্ন জনপদে ঘুরে বেড়ায়। এদিকে এক্ষেত্রে সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো এটির ভেলোসিটি বা গতিময়তা অনেক বেশি। কেননা ন্যায়সঙ্গত শ্রমের চেয়ে তুলনামূলক প্রাপ্তি বেশি বিধায় এই কালো টাকা ব্যয় করার সময় অর্থনীতির নিয়ম-কানুন মেনে চলে না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কালো টাকা নিয়ে নিম্নে কিছু স্থূল ও সূক্ষ্ম পরামর্শে ব্রতী হয়েছি। উল্লেখ্য যে, সুদূরপ্রসারী ফলপ্রসূ অর্থনীতির আওতায় সাদা টাকার সাথে কালো টাকাকে হিসেবে আনতে হবে এবং যুক্তরাজ্যের মডেল অনুসরণ করা সঙ্গত কারণেই বিধেয় বলে মনে করি। সত্যি কথা বলতে কি, কোন অজাত থেকে জাতে উঠাতে কাঠ-খড়ি পোহাতে হয়, যেমন অপারেশন করে রোগী বাঁচলেও দাগ থেকে যায় এবং কিছু অসুবিধা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। তাই কালো টাকা যাতে গজাতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং গোড়াতেই জন্মের পরিবেশ বিনষ্ট করা বিধেয়। রোগ যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ বিশ্বের মাঝামাঝি দেশ হিসাবে অর্থনীতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনার মাধ্যমে কালোকে সাদা করার জন্য গ্রহণীয় অবস্থা সৃষ্টি করতে হবে। বাত্সরিক জাতীয় বাজেটে সাদা টাকার সাথে কালো টাকার জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পূর্বেই বলেছি, কালো ও সাদা টাকা সমান্তরাল গতিতে চলে বিধায় কালো টাকা হলেও এটি খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। আর অবশ্যই রাজস্ব খাত ব্যতিরেকে মূলধনীয় বিনিয়োগের দিকে চালিত করতে হবে। তবে এক্ষেত্রে বাড়িঘর, জমি, অলংকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিরুত্সাহিত করতে হবে। কালো টাকা ছাড়া কোন পুঁজি গঠিত হয় না। যদি একটি বাস্তব উদাহরণে যাই, তাহলে দেখা যায় স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই শিল্প বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। তখন টিসিবি (TCB) ছাড়া কেউ পণ্য আমদানি করতে পারতো না। কেননা বড় অংকের আমদানি করার মতো তেমন কোন পুঁজিপতি ছিল না। অথচ এখন টিসিবি ছাড়াই হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করা হয়ে থাকে। বেসরকারি ব্যাংক-বীমা, শিল্প প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পূর্ব হতে বর্তমানে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক্ষেত্রে যেভাবেই বলুন না কেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কালো টাকারই পরোক্ষ প্রভাব বা ফল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এত বছরে বিশাল অংকের কালো টাকার মধ্যে কিছু টাকা সাদা করা হলেও এখন অনেক কালো টাকা অব্যবহূত অবস্থায় রয়েছে, যা দিয়ে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে যাতে বিনিয়োগ করা যায়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে এবং যুগপত্ বিদেশি ঋণ গ্রহণ নিরুত্সাহিত করতে হবে। এদিকে প্রখ্যাত জার্মান অর্থনীতিবিদ ডেভিড মেরিলের বক্তব্যের আলোকে কালো টাকার পরিমাণ নিরূপণসহ ধারকদের চিহ্নিত করতে হবে, যাতে পরবর্তীতে অর্থনীতির অনুকূলে ইতিবাচক কার্যক্রম নেয়ার পথ সুগম হয়। এতদ্ব্যতীত বিশ্বায়নের নামে কালো টাকার পথ যেন প্রশস্ত হয়ে অর্থ পাচার না করে, সেদিকে নীতি নির্ধারকদের খেয়াল রাখতে হবে। পরিশেষে এই বলে শেষ করছি, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না থাকলে যতখানি ভাল হবে, অথচ সুযোগ দিলে তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ভাল হবে, যা চোখ বুঁজে আর্থিক প্যারামিটারগুলো বিবেচনায় এনে যদি ভাবেন তাহলে সহজে বুঝা যাবে। তবে এটি সত্য যে, কালো টাকা যাতে জন্মাতে না পারে, সেটার দিকে সরকারসহ দেশবাসী উভয়েরই চোখ-কান-মুখ খোলা রাখতে হবে। কেননা কালো টাকা বর্ডার লাইন অতিক্রম করলে সমাজকে ধীরগতিতে কুরে কুরে খেতে থাকবে এবং সামাজিক দিক দিয়ে নৈরাজ্য ও অবক্ষয়ের ঘন তমসা নেমে আসবে। লেখক : অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক