রাজনৈতিক ফরমালিন বা প্রতিহিংসার রাজনীতি
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৪, ২২:১১
এখানে আকাশের কান্না বাতাস বোঝে না। বাতাসের হাহাকার শূন্যতা অনুভব করে না। আবার চাঁদের আলোও মেঘের কাছে নিষ্প্রভ কিংবা মেঘের ব্যথায় চাঁদ পুলকিত। বুড়িগঙ্গা দূষিত বর্জ্য-আবর্জনায়, শীতলক্ষ্যা কলুষিত লাশের স্পর্শে। সুরমার চোখের জল চোখেই শুকায়। তৃষ্ণায় ছটফট করে তিস্তা। প্রতিবন্ধকতার আশংকায় তিতাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার যৌবন অকালেই ঝরে গেল। এসব দিকে লক্ষ্য করার কেউ নেই। সকলেই আছে রাজনীতি নিয়ে। প্রতিহিংসার রাজনীতি। কে কাকে টপকে উপরে যাবে, কে কাকে উপরে উঠতে দিবে না এসব নিয়ে মত্ত থাকে। আর এই মত্ততা বা উন্মাদনার শিকার হয় কেউ কেউ। সম্প্রতি নায়ারণগঞ্জে ৭টি খুন ও ফেনীতে একটি খুন খুবই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এরকম খুনের ঘটনা অহরহ ঘটছে যা কারো কাম্য হতে পারে না।
রাজনীতি যদি উদার না হয়, রাজনীতি যদি দেশ ও মানুষের ভালবাসায় নিবেদিত না হয় তা হলে কি তাকে রাজনীতি বলা ঠিক হবে? রাজনীতিতে বর্তমানে যদি ভালবাসা বলে কিছু থাকতোই তবে এত গুম-খুন-অপহরণ দেখতে হতো না। একমাত্র অপ-রাজনীতির কারণেই সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কে বসবাস করছে। কারো কারো প্রভাব-প্রতিপত্তি এতটা বেড়ে গেছে যে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী বা প্রশাসনকে পর্যন্ত তারা ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে। একটি দেশের নিম্নগামিতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের ঘটনা। টাকার বিনিময়ে হোক বা অন্য কোন চাপে হোক র্যাবের এমন সংশ্লিষ্টতা সবাইকে আহত করেছে, হতবাক করেছে। যারা শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় কাজ করবে, গণ-মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, সন্ত্রাসীদেরকে উত্খাত করবে তারা যদি সন্ত্রাসের সংগে সম্পৃক্ত হয় তবে আর সে-দেশে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব নয়। আমরা চাই না এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক, আমরা এটাও চাই না র্যাব বিলুপ্ত হোক— আমরা চাই তারা সঠিক দায়িত্ব পালন করুক। আর একটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি তা হল র্যাব বা পুলিশ কর্তৃক অপহরণ কথাটি যেন আর উচ্চারিত না হয়— তাদের জন্য ‘গ্রেফতার করা’ বা ‘আটক করা’ শব্দগুলো প্রযোজ্য। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যেন রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকে। তাদের কোন দল থাকবে না, কোন প্রতিহিংসাপরায়ণ কাজে অংশ নেবে না।
রাজনীতিতে প্রতিহিংসা এতটাই প্রকট হয়েছে যে কে কী বলছেন, কে কী করছেন তার ব্যাখা উদ্ধার করা কষ্টসাধ্য। সুদূর লণ্ডনে বসে তারেক রহমান বারবার বঙ্গবন্ধুকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়ে চলেছেন। তারেককে অনুরোধ করব- কথা বলার আগে ভাবতে হবে কাকে নিয়ে কী মন্তব্য করছেন, তাতে কার কী ক্ষতি হবে। আপনার কথায় আপনার দলীয় লোকও যে নাক সিঁটকাচ্ছে তা হয়ত আপনি বুঝতে পারছেন না। কারণ অযৌক্তিক ও মিথ্যা কথা কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং একটি পরামর্শ দিতে পারি- তারেক যেন বঙ্গবন্ধুর জীবনী একবার পড়ে দেখেন। যদি বড়গুলো পড়তে সময় না পান ছোটদের বঙ্গবন্ধুও পড়তে পারেন। সেইসাথে শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবনীও পড়ে দেখতে পারেন শহীদ জিয়া বঙ্গবন্ধুকে কতটা ভালবাসতেন, কতটা শ্রদ্ধা করতেন। এই হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও কথাবার্তা থেকে বের হতে না পারলে সুষ্ঠু ও শুদ্ধ রাজনীতিচর্চা সম্ভব নয়। এদিকে এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন বিএনপিকে ফরমালিন দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কথাটা যদি তিনি রসিকতা করে বলেও থাকেন তাতে বিএনপি ক্ষুব্ধ হবে সন্দেহ নেই। পরদিনই বিএনপির মহাসচিব বলেছেন আওয়ামী লীগ সরকারই ফরমালিনযুক্ত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে কথার পিঠে কথা চলছে। হিংসার কথা, প্রতিহিংসার কথা, বিদ্বেষের কথা, বিদ্রুপের কথা। এতসব কথার ভারে আমরা জর্জরিত। আসল কথায় ফিরতে পারি না। সমৃদ্ধশালী দেশ গঠনে কীভাবে আরও প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়, কীভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি করা যায়, কীভাবে পণ্য রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যায়, কীভাবে শ্রমশক্তিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করা যায়, কীভাবে শিক্ষার মান উন্নয়ন করা যায়, কীভাবে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বেড়ে উঠতে সহায়তা করা যায়, কীভাবে আগামীতে দেশটা আরও সুন্দর করে গড়ে তোলা যায় এসব নিয়ে খুব একটা বিচলিত হতে দেখি না রাজনীতিবিদদের। রাজনীতি মানে খুনোখুনি-হানাহানি নয়, রাজনীতি মানে গুম-অপহরণ নয়, রাজনীতি মানে নদী-খাল দখল নয়, রাজনীতি মানে বন উজাড় করা নয়, রাজনীতি মানে চাঁদাবাজি-টেণ্ডারবাজি নয়, রাজনীতি মানে ধর্ষণ-উত্পীড়ন নয়— রাজনীতি মানে দেশ ও মানুষের কল্যাণ সাধিত করা, শুধু ভালবাসা আর ভালবাসা। সেই ভালবাসায় পরিপ্লুত হতে আমরা তো চাই আমাদের নদীগুলো কলুষমুক্ত ও দূষণমুক্ত হয়ে স্বচ্ছ ও নির্মল জলে ভরে উঠুক। আমরা তো চাই আমাদের স্বপ্নের বাগান ফুলে ফুলে সৌন্দর্যময় হয়ে উঠুক। আমরা তো চাই শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত হাসির মতো এই বাংলাদেশ হাসুক।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক