মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে রিট
সংবিধান সংশোধন হল সম্পত্তি হস্তান্তর হল না
প্রকাশ : ০২ জুন ২০১৪, ২৩:১৪
রায়ে ৯০ দিনের মধ্যে হস্তান্তরের নির্দেশ থাকলেও পেরিয়ে গেছে চার বছর
বহুল আলোচিত মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি ফেরত চেয়ে উচ্চ আদালতে বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিলো মার্শাল ল’ রেগুলেশন্সের। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেই রেগুলেশন্সকে অবৈধ ঘোষণা করে সিনেমা হলটির সম্পত্তি এর মূল মালিককে ফেরত দিতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলো হাইকোর্ট। ওই রায় সর্বোচ্চ আদালত বহাল রাখার পরেও পেরিয়ে গেছে চার বছর। এই রায়ের মাধ্যমে বাতিল হলো সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী, আনা হলো নতুন সংশোধনী। অথচ যে ব্যক্তির চ্যালেঞ্জের সূত্র ধরে এই ঐতিহাসিক রায়, সেই মাকসুদুল আলম আজ পর্যন্ত মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি ফেরত পাননি।
মুন সিনেমা হল ভেঙ্গে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতলবিশিষ্ট মুন শপিং কমপ্লেক্স। ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। ইতিমধ্যে মূল মালিককে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে কয়েকদফা চিঠি চালাচালি ও বৈঠকের পরেও কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি রিটকারী ও বিবাদী পক্ষ। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কৌঁসুলি সাবেক অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেন, মুন সিনেমা হল তো আর আগের অবস্থায় নেই। সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল মার্কেট। ফলে ওই সম্পত্তির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। এই অবস্থায় ট্রাস্ট, রিট পিটিশনারের আইনজীবী, বাবুলী কনস্ট্রাকশন ও দোকানদার মালিক সমিতিকে নিয়ে ৬টি বৈঠক করেছি। তবে বাস্তবতার নিরিখে কোন সমাধানে পৌঁছাতে পারিনি। কিভাবে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব— এমন প্রশ্নের জবাবে এমকে রহমান বলেন, সরকার যদি কোম্পানির কাছে সম্পত্তিটা হস্তান্তর করে দিত তাহলে দোকানদারদের সঙ্গে মূল মালিকের একটা সমঝোতা হতে পারতো। কিন্তু আজ পর্যন্ত সম্পত্তিই হস্তান্তর করা যায়নি।
সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় সরকারের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেছেন বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও রিটকারী মাকসুদুল আলম। তবে তার সঠিক অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষের মাঝেও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাস্টের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, আপিল বিভাগের রায়ের পর আজ পর্যন্ত মূল মালিককে তারা দেখতে পাননি। তিনি নিজে সম্পত্তির দাবি নিয়ে আসেননি, তার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেডে লোক পাঠিয়েও তার হদিস মেলেনি।
তবে মাকসুদুল আলমের আইনজীবী ব্যারিস্টার এবিএম সিদ্দিকুর রহমান খান ইত্তেফাককে বলেন, সিনেমা হলের মূল মালিক একজন অবাঙ্গালি। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি জীবিত ও সুস্থ আছেন। যদি সেটি না হতো তাহলে কিভাবে তিনি আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করলেন? এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কৌঁসুলি এমকে রহমান বলেন, ‘মালিক আছেন। যদি জীবিত না থাকেন তো কি হয়েছে? আইনি প্রতিনিধি আছেন। আর কোম্পানি তো রয়েছে। কোম্পানির কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর হবে। এক্ষেত্রে আইনগত কোন বাধা নেই।’
উল্লেখ্য, সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ এ রায় ঘোষণা করে। রায়ে ৬০ দিনের মধ্যে রিটকারীকে মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। পরে এ রায়ের কিছু বিষয়ে পুনর্বিবেচনার জন্য ২০১১ সালে রিভিউ পিটিশন দায়ের করে শিল্প মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। ২০১১ সালের ৫ মে দেয়া রিভিউ পিটিশনের রায়ে ৬০ দিনের স্থলে ৯০ দিনের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের নির্দেশ দেয় আদালত। রায়ে বলা হয়, ‘সকল ধরনের দখলমুক্ত অথবা সকল বিরোধ শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করে তিন মাসের মধ্যে মূল মালিকের কাছে (রিটকারী) হস্তান্তর করতে শিল্প মন্ত্রণালয় ও মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে নির্দেশ দেয়া গেলো।”
এদিকে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় আসার আগেই ২০০১ সালের ২৪ জুন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কনস্ট্রাকশন এক চুক্তি স্বাক্ষর করে। মুন সিনেমা হলের সম্পত্তিতে বহুতল মার্কেট নির্মাণের লক্ষ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই চুক্তি অনুযায়ী মুন সিনেমা হলের শূন্য দশমিক ৬২ একর জমিসহ বাবুলী কনস্ট্রাকশনের জমি মিলিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হয় সাত তলা মুন শপিং কমপ্লেক্স। এখনো পুরোপুরি মার্কেটটি নির্মাণ সম্পন্ন হয়নি। তবে সাত তলা পর্যন্ত নির্মিত মার্কেটটিতে ছোট বড় মিলিয়ে এক হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। মার্কেটটির গ্রাউন্ড ফ্লোর পুরোপুরি চালু হয়ে গেছে। অন্যান্য তলার দোকানগুলোতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ঝুলানো রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক যুগ্ম সচিব শেখ রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, মুন সিনেমার ৬২ শতাংশ এবং বাবুলী কনস্ট্রাকশনের কিছু জমি মিলিয়ে মার্কেট নির্মাণের লক্ষ্যে চুক্তি স্বাক্ষর করে ট্রাস্ট। ওই চুক্তিতে বলা হয়েছিলো, ভবন নির্মাণ করে সালামি নিয়ে দোকানীদের বসিয়ে দেবে বাবুলী কনস্ট্রাকশন। আর ওই মার্কেট থেকে যে ভাড়া আসবে সেটি পাবে কল্যাণ ট্রাস্ট। তিনি বলেন, মার্কেটটি আংশিক চালু হয়েছে। পুরোপুরি চালু না হওয়ায় ট্রাস্ট এখনো কোন ভাড়া পাচ্ছে না। এছাড়া মার্কেটটি এখনো ওই ডেভেলপার কোম্পানির কাছ থেকে ট্রাস্ট বুঝে নেয়নি বলে জানান রফিকুল ইসলাম।
মুন সিনেমা হলের সম্পত্তিতে ডেভেলপার কোম্পানি দিয়ে বহুতল শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে দোকান বিক্রি করায় মূল মালিকের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। রিট পিটিশনারের আইনজীবীরা রায়ের আলোকে বাধামুক্ত অবস্থায় মূল মালিককে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দিতে কয়েক দফায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সচিবকে চিঠি দিয়েছেন। এ সব চিঠির জবাবে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে পাল্টা চিঠি দিয়ে বলা হয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সম্পত্তি হস্তান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কল্যাণ ট্রাস্টের এক কর্মকর্তা বলেন, এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কল্যাণ ট্রাস্টের সদিচ্ছার অভাব নেই। রিট পিটিশনারের আইনজীবীরা এটি পুরোপুরি দখলমুক্ত অবস্থায় তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে বলেছেন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় এটি সম্ভব নয়। কারণ বহুতল শপিং কমপ্লেক্স করায় ডেভেলপার কোম্পানি ও দোকান মালিকদের সম্পত্তির উপর অধিকার জন্মেছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, আমরা ডেভেলপার কোম্পানি বাবুলী কনস্ট্রাকশন ও দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা এই সম্পত্তির মূল মালিক হিসেবে মাকসুদুল আলমকে মেনে নিতে রাজি আছেন। এ নিয়ে একাধিকবার রিট পিটিশনারের আইনজীবীর সঙ্গে বৈঠক করেছি। কিন্তু সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি। তবে পিটিশনারের আইনজীবী সিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, দখলমুক্ত অবস্থায় বিবাদীরা সম্পত্তি আমাদের ফেরত দেবে। সম্পত্তিতে কি আছে সেটা আমাদের দেখার বিষয় নয়।
এদিকে মুন শপিং কমপ্লেক্সের চতুর্থ তলায় রয়েছে বাবুলী কনস্ট্রাকশনের অফিস। গত বৃহস্পতিবার সেখানে কথা হয় প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা বলেন, তারা মালিক হিসেবে কল্যাণ ট্রাস্টকে চেনেন। যদি তাদের এই জায়গা ছেড়ে দিতে হয় তাহলে তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেয়া হোক। তারা মুন সিনেমা হলের যে জমি, সে অংশ ছেড়ে চলে যাবেন। কারণ আদালতের রায়ের পর তারা পুরোপুরি মার্কেটটি চালু করতে পারেননি। যারা দোকান কিনেছেন তারাও উদ্বিগ্ন। দোকান বিক্রিও কমে গেছে। ৪০ ভাগ দোকান এখনো অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে বলে জানান তারা।
আদালত অবমাননার মামলা
রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় রিটকারী মাকসুদুল আলম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ২০১৩ সালের ২৯ জুলাই আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেন। এতে বলা হয়, আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই সম্পত্তি হস্তান্তরে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হয়েছেন বিবাদীরা। ওই সম্পত্তির বর্তমান ভোগদখলকারীদের সরাতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। এর পেছনে খোঁড়া সব যুক্তি উপস্থাপন করেছেন বিবাদীরা, যা গুরুতর আদালত অবমাননার শামিল। ফলে রিটকারী সংবিধানের ৫ম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলার ফল ভোগ করতে পারছেন না। এ মামলায় বিবাদী মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সচিব, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, কোতয়ালি সার্কেল (ভূমি) সহকারী কমিশনার, অতিরিক্ত উপকমিশনার (ভূমি) ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের প্রতি নোটিশ জারি করে আদালত। এরপর ওই নোটিশের ওপর কোন শুনানি হয়নি।
পেছনের কথা
পুরান ঢাকার ১১ নম্বর ওয়াইজঘাটে পাকিস্তান ইটালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি ছিল। কোম্পানির মালিকরা পরে সেখানে মুন সিনেমা হল তৈরি করে। একাত্তর সালের শেষ দিকে একদল লোক সেটি দখল করে নেয়। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর তত্কালীন রাষ্ট্রপতির এক আদেশে শিল্প মন্ত্রণালয় পরদিন থেকে এটিকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে এটি দখলে নেয়। ১৯৭২ সালের ২৮ নভেম্বর জয়েন্ট স্টক কোম্পানির এক আদেশে কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ইটালিয়ান মার্বেলস ওয়ার্কস লিমিটেড রাখা হয়। পরে শিল্প মন্ত্রণালয় সম্পত্তিটি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে ন্যস্ত করে। ১৯৭২ সালের ২৮ এপ্রিল কোম্পানিটি মুন সিনেমা হল ফেরত চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয় ১৯৭৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তি হওয়ায় তা মুক্ত করে দেয়া সম্ভব নয় বলে কোম্পানিটিকে জানিয়ে দেয়। ১৯৭৭ সালের ৭ নম্বর মার্শাল ল’ রেগুলেশনস (এম এল আর) জারি করেন জিয়াউর রহমান। এটি ছিল পরিত্যক্ত সম্পত্তি ক্রয় সংক্রান্ত। এতে বিধান করা হয় যে, সরকার যে সব বাড়ি পরিত্যক্ত ঘোষণা করবে, সেটাই চূড়ান্ত। তার সিদ্ধান্তের বৈধতা সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। এই মার্শাল ল’ রেগুলেশন্সের আওতায় মুন সিনেমা হলের সম্পত্তি পড়ে যায়। পরে এ সম্পত্তির মালিকানা ফেরত পেতে ২০০০ সালে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করে ইতালিয়ান মার্বেল ওয়ার্কস লিমিটেড। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ২৯ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেয়। রায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মোশতাক, বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণ সংবিধান-বহির্ভূত এবং বেআইনি ঘোষণা করা হয়।