আলোকপাত

দীক্ষার দৈন্য

শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে দীক্ষিত হওয়া বেশি জরুরি। কারণ, শিক্ষা জানায়; দীক্ষা মানায়ও। শিক্ষা শেখায়; দীক্ষা দেখায়ও। শিক্ষা শিখা; দীক্ষা দীপিকা। শিক্ষার বাহন পুথি-পুস্তক। দীক্ষার বাহন পণ-প্রতিজ্ঞা। শিক্ষা ভবিষ্যত্-রূপকল্প। দীক্ষা স্বপ্ন পূরণের সংকল্প। শিক্ষার চালিকাশক্তি মেধা ও বুদ্ধি। দীক্ষার চালিকাশক্তি বিবেক ও মনন। দীক্ষা সাধনার ধন। শিক্ষা অধ্যয়নের ফসল কিংবা ভিক্ষার ধন। তবে মন্দার্থে নয়। শিক্ষার্থী শিক্ষকের কাছে শিক্ষা ভিক্ষার্থী। তাই, যে যতো বেশি শিক্ষিত, তাকে ততো বেশি ভিক্ষিতও বলা যায়। তবে সেই ধনও মন বোঝে। শিক্ষণে যার মন নেই, সেই অমনযোগী শিক্ষার্থীর মনের গোলায় জ্ঞান নামের ধন সঞ্চিত থাকে না। উচাটন মনের পাটাতন থেকে সে অজান্তেই পালিয়ে যায়। তপস্যা-তিতিক্ষার তপোবনে শিক্ষা সুরক্ষিত থাকে। বাল্যবেলা থেকেই আমরা একটা দ্বিত্ব শুনে অভ্যস্ত। এর নাম ‘শিক্ষা-দীক্ষা’। কিন্তু ইদানিং তেমনটা শুনি না। শুধু ‘শিক্ষা’টাই শুনি। ‘দীক্ষা’কে শিকেয় তুলে রাখা হয়েছে। ‘শিক্ষা’ যেন ডানাকাটা পরী। উড়ে যাবার ডানা নেই বলে পড়ে আছে। আর ‘দীক্ষা’র ডানা গজিয়েছে। তাই পাখা মেলে পালিয়েছে। ‘শিক্ষা’ উন্নয়নে অন্তহীন পরিকল্পনাও চোখে পড়ছে। তবে, ভাবমূর্তির তেমন ঔজ্জ্বল্য প্রতিভাত হচ্ছে না। ভাবমূর্তি মানে কিন্তু চিন্তা ও অনুভূতির পরিপূর্ণ রূপ। সেরূপ ‘ভাবমূর্তির’ এখন শুধু ভাবটা আছে। মূর্তিটা নেই। দশাটা ‘পরিকল্পনার’ মতোই। পরিকল্পনার ‘পরি’ও বাস্তবে নেই। ‘কল্পানা’তো নিজেই অবাস্তব। এ দুই অবাস্তব মিলে কী বাস্তবায়ন করে—তা কেবল বাস্তববাদীরাই জানেন। যাকগে। শিক্ষা আর দীক্ষা— এ দু’য়ে মিলে যে শিক্ষা, সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। আমাদের শিক্ষার সাথে এখন দীক্ষার দেখা মেলে না। এ দুজনা এখন আর হাতে হাত ধরে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটে না। গলায় গলায় ভাব নেই। এখন এদের বিচ্ছেদ ঘটেছে। ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’ এতে আমি ব্যথিত। এটাই দীক্ষার পক্ষে আমার উকালতির আসল কারণ। যে শিক্ষায় দীক্ষা নাই, সে শিক্ষা মানবকল্যাণে নিবেদিত হয় না। যিনি মানবকল্যাণে দীক্ষিত নন, এমন শিক্ষিত নিজে বাঁচে। অন্যকে বাঁচায় না। আর দীক্ষিত নিজের বাঁচাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অন্যকে বাঁচায়। বাঁচতে হলে সকলকে নিয়ে বাঁচে। মরতে হলে নিজে মরে, অন্যকে বাঁচায়। যে শিক্ষিত ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’— এ দীক্ষায় দীক্ষিত নয়— সে আত্মকেন্দ্রিক। আত্মসম্মানবোধহীনের মূল্যবোধ থাকে না। সে তার মূল্যও বোঝে না। নিজেকেও চেনে না। আত্মবৃদ্ধি তার কাজ নয়। অর্থবৃদ্ধিই তার মন্ত্র। ‘নিজেকে জানো’ মানেই নিজের সম্ভাবনা, নিজের আত্মিক ক্ষমতা এবং স্বরূপকে আবিষ্কার করা। যে শিক্ষিত মানুষ নিজেকে চিনেছে, সে বলে,‘চির উন্নত মম শির’ অথবা ‘আমি আপনারে ছাড়া করিনা কাহারে কুর্ণিশ।’ ভেতরের সম্ভাবনাকে সুপ্তির রাজ্য থেকে জাগিয়ে তুলে তখন সে দীক্ষিতের মতো প্রার্থনা করে, ‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি।’ ‘আজ সাধনাও নাই, সিদ্ধিও নাই, আজ বিদ্যার স্থলে বাচালতা, বীর্যের স্থলে অহংকার এবং তপস্যার স্থলে চাতুরী বিরাজ করিতেছে’— কবিগুরুর এ পর্যবেক্ষণে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির কথাই যদি বলি— ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ Reading between the lines.’—এ মন্ত্র শিক্ষিতের। ‘Reading between the lies.’—এ মন্ত্র দীক্ষিতের। আর শিক্ষিত এবং দীক্ষিতরা ‘Doing between the sighs.’—এ মন্ত্রের প্রণোদনায় অক্ষমতার দীর্ঘশ্বাসের মাঝে কর্মফলের মাধুর্য বিলিয়ে সভ্যতাকে এগিয়ে নেয়। শিক্ষিত ও দীক্ষিত — এ দুয়ের মেলবন্ধন জগতের সব গ্লানি মুছে দিতে পারে। সকল অনাচার রুখে দিতে পারে। পর্ণ কুটীরকে রূপান্তরিত করতে পারে স্বর্ণ কুটীরে। শিক্ষা-দীক্ষার দ্বিত্ব ‘দুর্বলেরে রক্ষা করে, দুর্জনেরে হানে।’ সভ্যতা-শকট দু’চাকার গাড়ি। গাড়ির দু’চাকাই সমান মাপের হতে হয়। নইলে সে গাড়ি পথ-পাড়ি দিতে পারে না। তেমনি সভ্যতা-শকটের এক চাকার নাম শিক্ষা। অন্য চাকার নাম দীক্ষা। এ দু’চাকা সমান তালে না চললে সভ্যতার গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছে না। জালালউদ্দীন রুমীর ‘মস্নবী’র একটি বয়ান দিয়ে শেষ করি: বেশ্নু আয্ ন্যা চুঁ হেকায়েত মীকুনাদ, ওয়ায্জুদায়ী হা শেকায়েত মীকুনাদ। ‘বাঁশির বিরহসুর অন্তরের কান পেতে শোন, সে কী মর্মস্পর্শী বিরহ বিধুর করুণ সুরে কাঁদছে। আর বাঁশবন থেকে তার আলাদা হবার গভীর দুঃখ-যন্ত্রণার অভিযোগ করছে।’ দীক্ষার বিরহ কাতরতাও সেই বাঁশির মতোই। শিক্ষার বিরহে বিলাপ করছে অসহায় দীক্ষা। বিরহের এ যন্ত্রণা থেকে সে মুক্তি চায় । শিক্ষা দুঃখের দিনে দীক্ষার দোসর হতে চায়। দীক্ষা সুখের দিনে শিক্ষার সখা হতে চায়। শিক্ষা দীক্ষায় দীক্ষিত হতে চায়। আবার দীক্ষাও শিক্ষায় ঋদ্ধ হতে চায়। তাদের মিলিত প্রয়াসে তারা মাতৃভূমিকে মহিমান্বিত করতে চায়। শিক্ষা ও দীক্ষা একাকার হয়ে সভ্য সমাজ গড়তে চায়। এরা জানে— জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নাম শিক্ষা নয়। আসলে শিক্ষা নিজেই জীবন। আর দীক্ষা সে জীবনেরই প্রাণ। সভ্যতার স্বর্ণদ্বারের তালা খুলতে হলে দু’খাঁজের একটা যোগ্য চাবি লাগে। সেই চাবিটার এক খাঁজের নাম শিক্ষা, আর অন্য খাঁজটার নাম দীক্ষা। আর তখনই সভ্যতার সেই স্বর্ণচাবির নাম হয়‘শিক্ষা-দীক্ষা’।  লেখক : গবেষক