পুুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন এখনো সরানো হয়নি

২০১০ সালের ৩ জুন রাতে মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড কারো সন্তান, কারো বাবা-মাকে কেড়ে নিয়েছিল। নিমতলীবাসীর জন্য গতকাল মঙ্গলবার ছিল বিভীষিকাময় সেই কালো দিন। রাসায়নিকের গুদাম থেকে সৃষ্ট আগুনে সেই রাতে কেড়ে নিয়েছিল নিমতলীর ১২৪টি তাজা প্রাণ। নিহতদের স্মরণে স্বজনরা অশ্রুপাত করে, মিলাদ আর দোয়া পড়ে দিনটি স্মরণ করেছেন। পাশাপাশি স্বজন আর স্থানীয়রা মানববন্ধন করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দীর্ঘ চার বছরে পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক উপাদানের গোডাউনগুলো সরিয়ে না নেয়ায়। দিনটি উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে যোহর নামাজের পর নবাবকাটারা ছাতা মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ দোয়া। অগ্নিকাণ্ডের চার বছর পূর্তিতে সকালে নবাবকাটরা ছাতা মসজিদের সামনের গলিতে মানববন্ধন ও নাগরিক সমাবেশের আয়োজন করে সিটিজেন রাইটস মুভমেন্টসহ কয়েকটি সংগঠন। সেখানে যোগ দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী মো. সেলিম নিজেও স্বীকার করেন দীর্ঘদিনেও রাসায়নিক উপাদানের গোডাউন সরিয়ে ফেলা হয়নি। এতে পুরান ঢাকা বসবাসের জন্য ডেঞ্জার জোন হিসাবে রয়েই গেছে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় বাড়ি মালিকদের তিনি সচেতন হওয়ার আহবান জানান। সমাবেশে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান বলেন, পুরান ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী রাসায়নিকের গুদাম সরাতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। আর এ দায়িত্ব সরকারের। নিমতলীর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এখনও সরকারের প্রতিশ্রুত সহায়তা পায়নি দাবি করে মঞ্জুরুল আহসান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে সংগৃহীত টাকার সুষ্ঠু বন্টন করতে হবে। গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নুরুর রহমান সেলিম বলেন, এতোদিনেও পুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যাল গুদাম না সরানোয় নতুন করে আবার ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটার আশংকা থেকেই গেছে। গতকাল সকালে অগ্নি সচেতনতায় স্থাপিত স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন রিপন ও স্বপন নামে দুই ভাই। তারা জানান, ভয়াল আগুন তাদের পরিবারের সবাইকে কেড়ে নিয়েছে। অসহায়ের মতো তারা দুই ভাই বেঁচে আছেন। সেই রাতে আগুনে ৪৪/১ নম্বর বাড়ির বাসিন্দা মোসলেম খান নিজের স্ত্রী, শাশুড়ি আর নাতনিকে হারান। তিনিও সেদিন গুরুতর দগ্ধ হয়ে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিত্সা নেন। মোসলেম খান বলেন, দিনটি এলেই অনেকে অনেক বক্তৃতা আর প্রতিশ্রুতি দেন। পরে সব ভুলে যান। বুক ভরা কষ্ট নিয়ে আমরা শুধু বেঁচে আছি। দুপুরে আজিমপুর কবরস্থানে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে কাঁদছিলেন সৈয়দ রাশেদ হোসাইন জামিল। আগুনে তার মা, ছোট ভাই, ভাতিজা, খালা, দুই মামীমহ সাতজনকে হারান। পাশেই দাঁড়িয়ে দোয়া পড়ছিলেন দুই বোন সাকিনা আক্তার রত্না ও উম্মে ফারুয়া আক্তার রুনা। আগুনে এই দু’জনের পরিবারের মাসহ সাত সদস্য নিহত হন। গতকাল নিমতলী রোডে বিভিন্ন ধরনের দোকান খোলা থাকলেও নিমতলী মোড়ে শুধু একটি দোকান বন্ধ পাওয়া যায়। সেখানে একটি কালো ব্যানারের পাশে কালো পতাকা উড়ছিল। ঐ দোকানটি ফল ব্যবসায়ী মামুন মিয়ার। ভয়াল সেই রাতে তার সাত বছর বয়সী ছেলে বৈশাখ ঐ দোকানের ভেতরই দগ্ধ হয়ে মারা যায়। ওই ঘটনার প্রতিবাদে তিনি প্রতিবছর ৩ জুন নিজের দোকান বন্ধ রাখেন।