ভর্তুকির লক্ষ্যমাত্রা কমছে

২ লাখ ৫০ হাজার ২০ কোটি টাকার বাজেটে  অনুন্নয়ন ব্যয় ১ লাখ ৩২ হাজার ২০ কোটি টাকা  ঘাটতি ৬৭৪৯৮ কোটি টাকা  ভর্তুকি ২৬০৫৩ কোটি টাকা  প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৭.৩ শতাংশ  মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ৬ শতাংশ আসছে নতুন অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। এবারও কৃষি ও খাদ্যে বড় আকারের ভর্তুকি রেখে সবমিলিয়ে ২৬ হাজার ৫৩ কোটি টাকায় সীমিত রাখা হচ্ছে। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভর্তুকির লক্ষ্য ছিলো ৩২ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম কম থাকায় হিসেবের তুলনায় কম ভর্তুকি দিতে হয়েছে এ অর্থবছরে। আলোচ্য অর্থবছরের বড় অংশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন খাতে ছিলো স্থবিরতা। ফলে জ্বালানি কম ব্যবহারে এ খাতে ভর্তুকি কমেছে। এসব কারণে ঘাটতির পরিমাণও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সবমিলিয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য থাকলেও মার্চ পর্যন্ত তা ১৬ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকায় ঠেকেছে। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরের বাজেট দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী অনেক বেশি আস্থার সঙ্গে ব্যয়ের প্রাক্কলন করতে যাচ্ছেন। সরকারি বেতন ভাতা ও ভর্তুকিসহ অনুন্নয়ন খাতে চলে যাবে ১ লাখ ৩২ হাজার ২০ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী ২ লাখ ৫০ হাজার ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিতে যাচ্ছেন জাতীয় সংসদে। কাল বৃহস্পতিবার আসছে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরবেন তিনি। অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে সবমিলিয়ে ঘাটতির আকার দাঁড়াতে পারে ৬৭ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক ঋণ পাওয়া না গেলে নতুন বাজেটের ঘাটতি মেটাতে যথারীতি ব্যাংক ঋণের উপরই ভরসা করেই এগুচ্ছেন তিনি। সূত্র জানায়, আসছে বাজেটে বিভিন্ন খাতে ২৬ হাজার ৫৩ কোটি টাকার ভর্তুকির লক্ষ্য থাকতে পারে। এর মধ্যে কৃষিখাতে ৯ হাজার কোটি টাকা, খাদ্যে ভর্তুকির প্রস্তাব থাকছে ১৮০৩ কোটি টাকা। রফতানি খাতে প্রণোদনা দিতে এ খাতে ভর্তুকির প্রস্তাব থাকতে পারে ২৮৫০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) জন্য ভর্তুকি থাকতে পারে ২৪০০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ জুট মিল কর্পোরেশনের জন্য ভর্তুকির প্রস্তাব করা হচ্ছে ১৫০০ কোটি টাকার। তবে প্রয়োজন হলে এ বরাদ্দগুলোর আকার বাড়তে পারে এমন ঘোষণাও থাকছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবে। এদিকে ভর্তুকি কমালেও যথারীতি ঘাটতির আকার ছোট রাখতে হলে আগামী বছরে ইপ্সিত রাজস্ব অর্জন করতে হবে। নইলে ঘাটতি আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। যা সরকারের ঋণ নির্ভরতা বাড়িয়ে দেবে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবমিলিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচির আকার দাঁড়াচ্ছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রাক্কলিত ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা আদায় করবে। এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ হাজার ১৪০ কোটি টাকার। করবহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের বড় অংশই আসবে এনবিআর খাত থেকে। যদিও চলতি বছরে প্রাথমিক প্রাক্কলনের পর কমিয়ে আনা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর উপর প্রায় ২০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে আগামী অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা নির্ধারণ করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্পর্ক আছে। চলমান বিনিয়োগ বন্ধ্যাত্ব অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রাক্কলিত ঘাটতি আরো বিস্তৃৃত হওয়ার আশংকা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী, কমিয়ে আনা লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বছর শেষে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব কম আদায় হতে পারে। এই অবস্থায় আসছে বাজেটে বর্ধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নতুন কর বসানোর প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান। অবশ্য অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা যাবে বলে মন্তব্য করেন সাবেক এই অর্থ উপদেষ্টা। সূত্র মতে, আসন্ন বাজেটে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। যদিও এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক রয়েছে। সরকার এত বিশাল পরিমাণ ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। চলতি অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সাড়ে ১৬ শতাংশ করার লক্ষ্য থাকলেও প্রকৃত পক্ষে তা ১১ শতাংশের উপরে উঠানো যাচ্ছে না। আসছে অর্থবছরে এর লক্ষ্য ১৬ শতাংশই থাকছে। তবে গত অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বড় আকারের ঋণ নেয়ার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিল। আসছে নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য রাখা হচ্ছে ৬ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি সাত শতাংশে বেঁধে রাখার লক্ষ্য থাকলেও তা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য থাকছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে অর্জন হতে পারে ৬ দশমিক ১ শতাংশ।