‘রূপবান’ কন্যার গল্প শুনি...

‘রূপবান’ দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক ছবির নাম। এ ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন চিত্রনায়িকা সুজাতা। এখন পর্যন্ত জীবন্ত এই কিংবদন্তি নায়িকা প্রায় তিন শ ছবিতে অভিনয় করেছেন। তবে বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চেয়ে নাটকেই অভিনয় করছেন বেশি। বহুদিন পর তিনি মুখোমুখি হয়েছেন আমাদের সাথে। তাকে নিয়ে লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায় রাজধানীর পশ্চিম রামপুরার ওয়াবদা এলাকায় চিত্রনায়িকা সুজাতা ছেলে ফয়সাল আজিম ও দুই নাতি ফারদিন আজিম, আবিয়াজ আজিমকে নিয়ে সুখের সময় পার করছেন। তবে সুখের এই পৃথিবীটা হয়তো আরও বেশি উপভোগ্য হয়ে উঠত যদি তার স্বামী চিত্রনায়ক আজিম বেঁচে থাকতেন। এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে দর্শক সমাদৃত এই নায়ক আজ থেকে প্রায় একযুগ আগে এই পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। একইসঙ্গে জীবনের পথে আজিম-সুজাতা চলতে শুরু করেছিলেন ১৯৬৫ সালে ‘ডাকবাবু’ ছবিতে অভিনয়ের সময়। তখন শুধু দু’জনের প্রতি দু’জনের ভালোবাসা। এর ঠিক দুই বছর পরই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা দু’জন। আমৃত্যু সে সম্পর্কে ছিল পবিত্র এক বন্ধনে জড়ানো। স্বামী আজিম কিংবা সহকর্মী কিংবা বন্ধু আজিম আজ নেই সুজাতার জীবনে কিন্তু তারপরও তার দেখানো পথ, তার স্মৃতি নিয়ে ছেলে আর নাতিদের নিয়ে সুজাতা বেশ ভালো আছেন। মাঝে বেশ কয়েকটি বছর তিনি অভিনয় থেকে দূরে থাকলেও এখন তিনি নিয়মিত নাটকে এবং এর পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করছেন। কেমন উপভোগ করছেন এই সময়ের নাটক-সিনেমা? জবাবে সুজাতা বলেন, ‘যাদের নাটক কিংবা চলচ্চিত্রে কাজ করি না কেন সবাই আমাকে যথেষ্ট সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্রাম দিয়ে, যতটুকু সম্ভব পরিশ্রম কমিয়ে কাজ করানো যায় সেই চেষ্টাটুকুই আন্তরিকভাবে করেন সবাই।’ সুজাতার কথার সূত্র ধরেই বলতে হয় সেদিন দুপুরে যখন গাজীপুরে সাজ্জাদ হোসেন দোদুলের ‘সংঘাত’ ডেইলি সোপের লোকেশনে যখন পৌঁছাই তখন কয়েকটি দৃশ্যে কাজ করা শেষে সুজাতা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ঠিক এমনভাবেই সুজাতা যখন যে সেটে কাজ করেন একজন শ্রদ্ধাভাজন অভিনেত্রী হিসেবে তিনি যথেষ্ট সম্মান এবং প্রশান্তির মধ্যদিয়েই কাজ করার সুযোগটা পান। ফিরে যাই ১৯৬৫ সালের কথায়। ‘রূপবান’ ছবিটি ওই বছরই মুক্তি পাওয়ার পর সারা দেশজুড়ে রূপবান কন্যা সুজাতার নাম ছড়িয়ে পড়ে। রূপবান কন্যাকে সরাসরি দেখার জন্য লোকজন অস্থির হয়ে পড়েছিল। তখন সবার মুখে মুখে ছিল—‘ও দাইমা কিসের বাদ্য বাজে গো’, ‘সাগর কূলের নাইয়ারে’, ‘মনের দুঃখ কইনারে বন্ধু রাইখাছি অন্তরে’, ‘বিদায় দেন বিদায় দেন’—এ রকম প্রায় ৩০টি গান ছিল ‘রূপবান’ ছবিতে। ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সত্যিই ‘রূপবান’ একটি মাইলফলক ছবি। সেই সময় মফস্বলের কোনো কোনো সিনেমা হলে ‘রূপবান’ একটানা এক বছর পর্যন্ত চলেছিল। সুজাতা ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন শীর্ষ নায়িকাদের একজন। সহ-নায়িকা হিসেবে ‘ধারাপাত’ ছবিতে অভিনয় করার আগে ‘দুই দিগন্ত’ নামে একটি ছবিতে নৃত্য দৃশ্যে অংশ নিয়েছিলেন। উর্দু একটি ছবিতে সহ-নায়িকা থাকার পর কাজী খালেক তার ‘মেঘ ভাঙা রোদ’-এ সুজাতাকে প্রথম একক নায়িকা হিসেবে নিয়েছিলেন। তবে ‘মেঘ ভাঙা রোদ’-এর আগে ‘রূপবান’ ছবিটি মুক্তি পায়। দেশীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জায়গা করে নেন ‘সুজাতা’। সুজাতার জন্ম কুষ্টিয়া শহরে। সেই সময় তার নাম ছিল তন্দ্রা মজুমদার। কুষ্টিয়ায় এক সময় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা শুরু হলে তারা কুষ্টিয়া ছেড়ে চলে এলেন ঢাকায়। সুজাতাদের সেই বাড়িটি নাকি পরবর্তীকালে দখল হয়ে যায়। তাই সুজাতা ও তার পরিবারের আর ফেরা হলো না কুষ্টিয়ায়। ঢাকায় বসবাস করে নাটক ও থিয়েটারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। সেইসময় নারায়ণ চক্রবর্তী, নাজমুল হুদা বাচ্চু, আমজাদ হোসেনসহ আরও অনেকের নির্দেশনায় মঞ্চ নাটকে অভিনয় করতেন তিনি। একসময় আমজাদ হোসেনই পরিচালক সালাহউদ্দিনের সাথে ‘তন্দ্রা’কে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তন্দ্রা নাম পরিবর্তন করে সালাউদ্দিন ১৯৬৩ সালে তার পরিচালিত ‘ধারাপাত’ ছবিতে সহ-নায়িকা হিসেবে নিয়ে নাম রাখেন ‘সুজাতা’। কুষ্টিয়ার গিরিজানাথ মজুমদার ও বীণা পানি মুজমদারের কন্যা তন্দ্রা হয়ে গেলেন চিত্রনায়িকা সুজাতা। রহমান-শবনম জুটির পর ‘আজিম-সুজাতা’ জুটি সফল হয়েছিল। আজিম ছাড়া সুজাতার বিপরীতে যারা অভিনয় করেছিলেন তারা হলেন—মেহমুদ, আনসার, সরকার কবির উদ্দিন, হাসান ইমাম, বুলবুল আহমেদ, রাজ্জাক, আলমগীর, ওয়াসিম, কায়েস, মান্নান, জাভেদ প্রমুখ। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৭০টি ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন সুজাতা। সুজাতা নির্দেশিত একমাত্র চলচ্চিত্র ‘অর্পন’। এটি তার নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে নির্মিত হয়েছিল। সুজাতা-আজিমের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থাগুলো হচ্ছে ‘সুজাতা প্রোডাকশন্স’, ‘এস এ ফিল্মস’ ও ‘সুফল কথাচিত্র’। এই তিনটি প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে নির্মিত হয়েছে ‘চেনা অচেনা’, ‘টাকার খেলা’, ‘প্রতিনিধি’, ‘অর্পন’, ‘রূপবানের রূপকথা’, ‘বদলা’, ‘রং বেরং’, ‘এখানে আকাশ নীল’ ইত্যাদি। অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন আপনি, অনেক ছবিরই প্রযোজক আপনি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার!! ‘নাহ্, আমি আজও পাইনি, কেন পাইনি জানি না। তবে এনিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই আমার, দর্শক আজও আমাকে ভালোবাসেন, সম্মান করেন—এটাই অনেক বড় কিছু। মানুষের ভালোবাসা নিয়ে ক’জন মানুষ বাঁচতে পারে!’