পরিবেশ দিবস

হতে হবে সোচ্চার, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়াবো না আর

আজ ৫ জুন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এর উদ্যোগে সারা বিশ্বে ১৯৭২ সাল হতে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদ্যাপিত হয়ে আসছে। এ বছর পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে “Raise your voice, not the sea level” যার বাংলায় ভাবার্থ নির্ধারণ করা হয়েছে “হতে হবে সোচ্চার, সমুদ্রের উচ্চতা বাড়াবো না আর”। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে শিল্প বিপ্লবের আবির্ভাব হয়। উত্পাদন বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষের ভোগের পরিমাণও বাড়তে থাকে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের অতি ভোগী মানসিকতা প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। শিল্প, পরিবহন, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে একচ্ছত্রভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হতে থাকে। মূলত এ কারণেই দূষণ ও উত্তাপ সৃষ্টিকারী গ্রীন হাউস গ্যাসগুলোর উদ্গীরণ অতিমাত্রায় বাড়তে থাকে। গ্রীন হাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে উল্লে¬খযোগ্যগুলো হলো— কার্বন-ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন। এই গ্যাসগুলো বায়ুমন্ডলে জমা হয়ে ঊর্ধ্বাকাশে একটি স্তর তৈরি করে। এই গ্যাসগুলো দ্বারা সৃষ্ট স্তরের মধ্য দিয়ে সূর্যের আলো ও তাপ পৃথিবীতে পৌঁছে যায় কিন্তু পৃথিবী হতে বিকিরিত উত্তাপ এই স্তর ভেদ করে ঠিকমত উপরে যেতে পারে না। এই উত্তাপ পর্যাপ্তভাবে বিকিরিত হতে না পারার কারণে বায়ুমন্ডল ও ভূ-পৃষ্ঠ ক্রমাগতভাবে উত্তপ্ত বা উষ্ণ হতে থাকে। বিশ্বের এই উষ্ণায়নের কারণে ঘটে চলেছে জলবায়ু পরিবর্তন। জাতিসংঘ ১৯৮৮ সালে গঠন করে ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)। তখন থেকে জলবায়ু সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এই প্যানেল বিশ্ববাসীর নিকট নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। আইপিসিসি-এর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় ১৮৯৯ হতে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৭৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। আঠার শতকে বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল ২৮০ পিপিএম, ২০০৫ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৭৯ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন ভল্যুয়ম)। ১৯০৫ সাল থেকে ২০০৫ সময়কালে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়েছে ১০-২০ সেন্টিমিটার। আইপিসিসি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ১.৭ হতে ৫.৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে এবং এর কারণে সমুদ্রের উচ্চতা ১৮ হতে ৭৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি হতে পারে। আর এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। বাংলাদেশের উপকূল এলাকায় যে শিশুটি বর্তমানে বেড়ে উঠছে, যখন তার বয়স পঞ্চাশ পেরুবে তখন হারিয়ে যাবে তার হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে বাবার সাথে হেঁটে যাওয়া ফসলের মাঠের আল, বাড়ির মায়াময় উঠোন, দিগন্ত বিসতৃত চোখ জুড়ানো সরিষার খেত কিংবা স্কুলের স্বপ্নময় আঙ্গিনা। আগামী দশকগুলোতে বিশ্বের তাপমাত্রা কী পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে তা অনেকগুলো নিয়ামকের ওপর নির্ভর করে। যদি আমরা বিশ্ববাসী গ্রীন হাউস গ্যাসগুলোর নির্গমনকে নিয়ন্ত্রণ না করি তাহলে ২১০০ সাল নাগাদ বিশ্বের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেতে পারে, আর যদি আমরা জোরালোভাবে গ্যাসগুলোর নিগর্মনকে নিয়ন্ত্রণ করি তাহলে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেতে পারে। আর এ জন্য আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলোকে পরিবেশ বান্ধবভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন হবে। এ কাজটি করতে নবায়নযোগ্য শক্তি উত্পাদন ও সকল ক্ষেত্রে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন্য বিশ্ব জিডিপি’র (মোট দেশজ উত্পাদনের) ২ শতাংশ ব্যয় করার দরকার হবে। তাপমাত্রা কত ডিগ্রী বৃদ্ধির জন্য সমুদ্র স্তর ঠিক কত সেন্টিমিটার স্ফীত হবে তা নির্ণয় করার কাজটি সহজ নয়। এর কারণ বরফ গলন প্রক্রিয়া কতিপয় কারণে খুব দ্রুততর হয়ে উঠতে পারে। তবে একথা নিশ্চিত, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সমুদ্র তল স্ফীত হবে। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বর্তমান উন্নতির দিকে নজর দেয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য একটি সবুজ পৃথিবী আমাদের রেখে যেতে হবে। আর এ লক্ষ্যে বিশ্বের ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করে যেতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সকলের বাসযোগ্য গ্রহ একটি এবং সকলের জন্য বায়ুমন্ডলও একটি। সুতরাং আজ আমাদের সোচ্চার হতে হবে— আমরা কোনোভাবেই সাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি করবো না, কোনো মানুষকে তাদের বাস্তুভিটা ত্যাগ করে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হতে দিব না, সাগরের লোনা পানিকে স্থলভাগে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি আর হতে দিব না। আশা করা যায়, আমরা সফল হবো।  লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজ, রাজশাহী