মুক্তধারা এবং উত্তর আমেরিকায় বাঙালির বইমেলা

আমি ঘরকুনো বই পড়া মানুষ। যার কারণে আমার কোলকাতা-দিল্লি, এমনকি সিলেট শহরটাও দেখা হয় নাই। সেই আমি প্রায় দেড় যুগ আগে অর্থাত্ ১৯৯৭ সনের গোড়ায় স্ত্রীর প্ররোচনায় তের হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরে আস্তানা গাঁড়ি। কুয়োর ব্যাঙ একেবারে সমুদ্রে পড়ে খাবি খেতে থাকি। ছোট ভাই এখানে ছিল, ‘শিশুকে’ হাত ধরে ধরে নিউ ইয়র্ক শহরের জটিল সাব-ওয়ে ট্রেনের এ-পারে নেমে ও-পারে উঠে কয়েকদিন শহরে চলা-ফেরার ‘ছবক’ দিয়ে, সেও মাস তিনেক পর কানাডায় ‘ফুড়ুত্’। আমি পড়লাম মহা বিপদে। পেটে বোমা মারলেও অচেনা কেউ ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলার পরও ‘ওয়েলকাম’ শব্দটি মুখ থেকে বেরোয় না। মাথা ‘নড’ করে কাজটি সারতে হয় মাঝে-মধ্যে এখনও। ভাবতে থাকি ‘ভাষার’ যা অবস্থা তাতে কাজ-কাম পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। দিনমজুরের কাজ-টাজ কিছু পেলেও ভাষার কারণে টিকিয়ে রাখা কষ্ট হবে। মনে মনে ভাবি, আমার মত কুড়ে আর অকর্মার বিদেশে আসা উচিত হয়নি। তাছাড়া আমি হচ্ছি ‘বই খাদক’। বই পাব কোথায়? ছোট ভাইয়ের ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’ আর ‘টাইমস’-এর ‘সাবসক্রিপশান’ ছিল। মাসে দুটো পত্রিকা পাওয়া যায়। তা পড়তে আবার ‘ডিকসনারি’ সঙ্গে নিয়ে বসতে হয়। যতদুর মনে পড়ে, তখন ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’ আর দু-একটি পত্রিকা এখান থেকে প্রকাশিত হতো। থাকি কুইন্সের সেই ‘সেন্ট জনস্’ কলেজের কাছা কাছি। আশপাশে মানে মাইল খানেকের মধ্যে ‘পশরা নামে’ একটি মুদি দোকান, সেখানে ‘ঠিকানা’ পাওয়া যায়। কিন্তু মাসে দুই ডলার খরচ করে পত্রিকা পড়ার সৌখিনতা সম্ভব নয়। হঠাত্ করে ‘ঠিকানা’য় এক বিজ্ঞাপন দেখে মনটা চাঙ্গা হয়ে উঠল। ‘মুক্তধারা’ নামের এক বইয়ের দোকান থেকে বই ধারে আনা যায়। কিন্তু সে তো সেই জ্যাকসন হাইটস। ছোট ভাই নিয়ে গিয়েছিল কাঁচা বাজার চেনাতে। যেতে আসতে আড়াই ডলার খরচ। সপ্তাহে একদিন গেলেও মাসে দশ ডলার। মনটা চুপসে গেল। এখনকার মতো তখন কিন্তু ট্রেন-বাসে চড়তে আনলিমিটেড আর ট্রান্সফার ছিল না। পাঁচ শিকি দিয়ে ‘ফুটো পয়সা’র মতো একটা কয়েন কিনতে হতো প্রতিটি রাইডের জন্য। আমার বাসস্থান থেকে জ্যাকশন হাইট যেতে বাস-ট্রেন দুটোই ধরতে হবে। যেতে আসতে মোট পাঁচ ডলার খরচ। হিসাব করি মাসে বিশ ডলার। ভাবি আমার বই পড়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বই না পড়ে চলবে কী করে। অতপর অনেক গবেষণা, স্ত্রী-ছেলের সাথে একাধিক বৈঠক করে সিদ্ধান্ত হলো, বাসে না উঠে দূরের ট্রেন স্টেশন থেকে শুধু ট্রেনে চেপে জ্যাকশন হাইট থেকে সাপ্তাহিক কাঁচা বাজার আর বই সংগ্রহ করা যাবে। ছেলেও এক কথায় রাজি, সে হিন্দি সিনেমা দেখতে পাগল। মুক্তধারা ক্যাসেট ধার দেয়। অতপর একদিন খুঁজে খুঁজে মুক্তধারায় হাজির। তখন মুক্তধারা দোকান ছিল আরো একটু ভেতরে। দোকানের ভেতরে ঢুকতেই হালকা পাতলা গড়নের, মাথার চুল হাতেই গুনে ফেলা যাবে, ছোট খাটো মানুষটি এমন একটা হাসির মতো দিয়ে তাকাল, মনে হলো জানতে চাইছে, ‘এত দিন কোথায় ছিলেন?’ সেই থেকে পরিচয়। বই পাওয়ার আনন্দে পরিচয়াদি বা নাম ঠিকানা জানা হলো না। পরে দেখেছি এবং জেনেছি লোকটি ছোটখাটো না। হালকা-পাতলা লম্বাটে, শত কষ্টে, ক্লান্তিতেও মুখে হাসিটি লেগেই আছে। বিশ্বজিত্ সাহা। আমি বাবু বলি সে দাদা বলে। এভাবেই চলছে দেড় যুগের মতো। গত কাল অর্থাত্ ২৪ মে ২০১৪, আমার পত্রিকার মালিক বা ‘সাপ্তাহিক প্রথম আলো ইউ এস এ’ পত্রিকার মালিক জনাব মিজানুর রহমান দুলাল জানাল, মুক্তধারার বিশ্বজিত্ সাহা আপনাকে খুঁজছে। ভাবলাম প্রতি বছর যেমন বইমেলা আসলেই ফোন করে বলবে, দাদা ব্রঙ্কসের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। আমি সবটুকু দায়িত্ব পালন করেছি কিনা বলতে পারব না। তবে বিশ্বজিতের অনুরোধ কখনো থেমে থাকেনি। দুলাল ফোনটা লাগিয়েই আমাকে দিয়ে তার দায়িত্ব শেষ। গত দু’বছর নিজের বয়স, বাংলা স্কুল এবং নানাবিধ কারণে বইমেলায় উপস্থিত হওয়া সম্ভব হয়নি। তাতে কিন্তু সে থেমে থাকেনি। স্ত্রী-ছেলের সঙ্গে দেখা হলেই অভিযোগ—দাদা এবার মেলায় আসেনি। আগামী বার আসতে হবে বলে দিয়েন। এই হলো বিশ্বজিত্। আমি আমতা আমতা করে কৈফিয়ত দিতে গেলেও, ফোন ধরেই জোরের সাথে অনুরোধ করল, এবার বইমেলায় উপস্থিত থাকতে হবে। তাছাড়া আরো জোর দিয়ে অনুরোধ করল, এবারের বইমেলায় একটা বিশেষ ক্রোড়পত্র ছাপাব। আপনি তো বইমেলায় ‘লেবু ভাই ফাউন্ডেশান’-এর ব্যনারে স্টল দিচ্ছেন দীর্ঘদিন। আপনাকে বইমেলা সম্পর্কে কিছু লিখতে হবে। বইমেলায় স্টল দেওয়ার একটা ইতিহাস আছে। আমেরিকায় আসার আগেই খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারি, বাঙালি যারা আমেরিকায় থাকে, নগদ আয়ের জন্য হয় টেক্সি চালায় অথবা হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ খোঁজে। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছি, এ দুটো কাজ করব না। কিছুদিন দারোয়ানি করার পর স্কুলে সাব-টিচিং-এর কাজ জোগাড় করা গেল। উচ্চতর ডিগ্রি আর স্কুলে পার্মানেন্ট কাজ পাওয়া যাবে এমন একটা স্কলারশিপও জোগাড় হলো। কিন্তু শতাব্দীর জঞ্জাল ‘ওসামা বিন লাদেন’-এর কারণে নাইন ইলেভেনের জন্ম। অতপর নিউ ইয়র্ক সিটির কোনো প্রিন্সিপ্যাল ‘মোহাম্মদ’কে হায়ার করার বদান্যতা দেখাল না। রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে স্কুলে কাজের আশা ত্যাগ করে, কম ভাড়ায় থাকার জন্য কুইন্স থেকে ব্রঙ্কসে মাইগ্রেশান। এখানে আসার পরই নিউ ইয়র্ক ইউনির্ভাসিটি থেকে নেওয়া প্যারালিগাল ডিগ্রির ওপর ভরসা করে কোনো এক ইন্ডিয়ান-এর রিয়েল স্টেট অফিসে একটা টেবিল ভাড়া নিয়ে প্যারালিগাল ব্যবসা শুরু করা গেল। কোন ক্লায়েন্ট আসে না। সারা দিন বই পড়া আর নোট করা মূল কাজ। হঠাত্ করে মনে পড়ে গেল, নিরোদ সি চৌধুরীর একটা ইন্টারভিউয়ের কথা। তিনি কেন পঞ্চাশ বছর বয়সে লিখতে আরম্ভ করলেন—এরকম এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘আপনাদের শরত্ বাবু তো সেই টিনএজ বয়সে শুরু করে বিশ বছর লিখেছেন। আমি পঞ্চাশ বছর বয়সে শুরু করে চুয়াল্লিশ বছর লিখছি।’ হঠাত্ করে মনে হলো, আমার বয়স তো এখন পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন হবে। আশার আলো দেখা গেল। কোনো দিন তো দু’লাইন লেখা হয় নাই, তবে পড়েছি কম না। দেখা যাক চেষ্টা করে। মাস চারেকের মধ্যে পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। বন্ধু-বান্ধবদের দেখালে তারা অভয় দিল—আপনার হবে। ইতোমধ্যে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সালাহউদ্দিনের সাথে ফোনে পরিচয়। তাকে পাণ্ডুলিপি পাঠালে, দারুণ প্রশংসা করে শতকরা আশিটি বানান সংশোধন করে একটা প্রশংসাপত্র সহ ফেরত পাঠালেন। ‘ক্লিপের স্তূপ থেকে’ লেখক রণজিত্ কুমার দত্তকে পাঠিয়েছিলাম এক কপি। তিনিও প্রশংসাপত্র সহ ফেরত পাঠান। অতপর নিজের টাইপ করা, নিজের প্রচ্ছদ, আর নিজের পাবলিশিং হাউজ ‘লেবু ভাই ফাউন্ডেশান’ থেকে প্রথম বই ‘ভেতো বাঙ্গালীর রোজনামচা’ প্রকাশিত হলো ২০০৪ সালে। মুক্তধারায় কয়েক কপি দিলাম। বিশ্বজিতের পরামর্শে সে বছরই বইমেলায় ‘লেবু ভাই ফাউন্ডেশান’ স্টল দেয়া গেল। সেই থেকে বইমেলায় নিয়মিত স্টল শুরু। আমি সব কাজেই আগেই উপস্থিত থাকি। বইমেলা শুরু বিকাল তিনটায়। আমি দশটার মধ্যেই হাজির। স্টল ঠিক করতে হবে। বিশ্বজিত্ আগেই হাজির। সবকিছু তদারকিতে। কার কী লাগে। আমাকে দেখেই সেই মিষ্টি হাসিটি দিয়ে, আপনার স্টলটা এখানে দেন। সব চাইতে ভালো জায়গাটা আমাকেই। হাসান দেরি করে আসে। আপনার স্টলটা ভালো জায়গায় পেয়েছেন। আমি ফাঁস করি না বিশ্বজিত্ জায়গাটা পছন্দ করে দিয়েছে। এত ব্যস্ততার মধ্যেও বিশ্বজিত্ সাহা হঠাত্ দুপুরের দিকে হাজির। হাতে একটা কাগজের ঠোঙ্গা। দাদা, এটা খেয়ে নিন। আমি কিছু খাই না বাইরে, বলার সময়ই দেয় না। ভাবলাম, শুধু আমাকেই বোধ হয় নাস্তা দিয়েছে। না সব স্টলেই একটা করে নাস্তার ঠোঙ্গা পৌঁছে দিচ্ছে। টেবিলটা একটু নড়বড় করছে। বলতেই কিছু একটা এনে ঠিক করে দেবে। সব দিকে দৃষ্টি। সব সময় মুখে সেই হাসি। লোকটা কাঁদতে জানে না। বিশ্বজিত্ সাহা কবে বইমেলা কবে শুরু করেছিল জানি না। তবে আমি যখন থেকে দেখছি, প্রতি বছর দুই বাংলার কবি-লেখকদের আমেরিকায় বইমেলায় আসার সুযোগ করে দিচ্ছে। আমার মনে হয়েছে, বহু কবি-লেখকরা যেমন বিশ্বজিতের বইমেলার সুবাদে আমেরিকা আসবার সুযোগ পাচ্ছেন; আমরাও যারা অখ্যাত কবি-লেখক বইমেলার সুবাদে নিজেদের লেখাকে অন্তত কিছু পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারছি। ২০০৯ সালে প্রকাশিত আমার ‘ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত্’-এর জন্য ‘জাহাঙ্গীর নগর এলামনাই অ্যাসোসিয়েশান’ এবং ‘চট্টগ্রাম এলামনাই অ্যাসোসিয়েশান’ যৌথভাবে আমাকে ক্রেষ্ট প্রদান করে। ওই দুই এলামনাই-এর কর্মকর্তারা বইমেলা থেকে আমার বই সংগ্রহ করেছিলেন। সবশেষে নিজের কাছেই প্রশ্ন রয়ে গেল—বিশ্বজিত্ আর বইমেলা দুটো কি এক না আলাদা। তবে বিশ্বজিত্ আর তার বইমেলার কারণে উত্তর আমেরিকায় হাজার কয়েক দোকানের নামফলক বাংলায়। অনেকগুলো বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয় উত্তর আমেরিকা থেকে। আর আমি একটা ‘বাংলা স্কুল-বাংলা বইঘর’ প্রতিষ্ঠা করার সাহস করেছি। তাই বিশ্বজিত্ এবং তার বইমেলা ‘সোনার হাতে সোনার কাঁকন কে কার অলঙ্কার?’