এক জীবনের কথা

একটি ইতিহাসনির্ভর গল্প

এক জীবনের কথা হুমায়ূন কবির প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক :সময় প্রকাশন প্রকাশকাল :২০১৪ মূল্য :৩০০ টাকা নানা চড়াই-উতরাই, বাধা-বিপত্তির মধ্যদিয়েই গড়ে ওঠে এক-একটি জীবন। সেই জীবনই একসময় হয়ে ওঠে কালের সাক্ষী। আর তা যদি স্থান পায় কোনো সাহিত্যিকের কলমে তবে তার রংটা ভিন্ন হবে সেটাই স্বাভাবিক। কোটি জীবনের মাঝ থেকে এমনই এক জীবনের চিত্র তুলে এনেছেন হুমায়ূন কবির। যে জীবন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা দেখেছে, দেখেছে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ। সাধারণ মানুষের বেশে নয়, ন্যায়-অন্যায়ের মাঝেই যাদের বসবাস সেই পুলিশের পোশাকে। হুমায়ূন কবির রচিত ‘এক জীবনের গল্প’ উপন্যাসটিতে নানা চরিত্র থাকলেও পুরো গল্পটি আবর্তিত হয়েছে পুলিশ চরিত্রটিকে ঘিরেই। মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর কবিতা-গান-নাটক-সিনেমাসহ শত শত গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। তবে হুমায়ূন কবিরের এই লেখা অনেকটা ভিন্ন ধাঁচের। অতি বর্ণনা অথবা পাঠককে বিভ্রান্ত না করে এককভাবে গল্প বলে গেছেন লেখক। এর ফলে বইটির সাহিত্যরস খুব বেশি উপভোগ্য না হলেও পাঠকের জানার ক্ষেত্রে বইটি হতে পারে একটি নতুন দিগন্ত। বইয়ের প্রধান চরিত্র আশরাফ। যে পুলিশের আর্মড ফোর্স থেকে থানার ওসি পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে কাজ করেছে। পেশাগত কারণে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার অন্যতম জায়গা কলকাতা ও সিলেটের বিভিন্ন জায়গায় কাটিয়েছে দীর্ঘ সময়। এই চরিত্রকে ধারণ করে লেখক তুলে এনেছেন মানবিক বিপর্যয়ের গল্প, ক্ষুধার গল্প ও বেঁচে থাকার নানা সংগ্রামের গল্প। আশরাফের জন্ম, বিবাহ ও কর্মজীবনের নানা ছবি সরল গদ্যে বর্ণনা করেছেন তিনি। পুলিশ প্রধান চরিত্র হওয়ায় লেখক নিপুণভাবে এঁকেছেন পুলিশের নানা অপকর্মের চিত্রও। দেখা গেছে, হাজারো মানুষ বর্ডার পাড়ি দিয়ে দেশ পরিবর্তনের আশায় খোলা আকাশের নিচে মৃত্যুকষ্ট ভোগ করছে, সেই সব মানুষের কাছ থেকে নির্লজ্জের মতো টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পুলিশ। উপদেশের ছলে লেখক তুলে ধরেছেন, ঘুষের মতো একটি বিষয়কেও কিভাবে নৈতিক ভেবে নেয় পুলিশরা। আশরাফকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপদেশ দিচ্ছেন এভাবে, ‘যদি ঘুষ নিয়ে নির্যাতিতের উপকার করে দাও তো ধরে নিও সেটাও নৈতিক। তবে জোর করে ঘুষ আদায় করা অনৈতিক। একজনের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে অন্য আর একজনের ক্ষতি করাও অনৈতিক।’ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সমাজের সকল স্তরের মানুষ। কিন্তু হাজারও বাঙালি সেই সময় সরকারি অফিস-আদালতে কী মানবেতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন—বাঙালি হওয়ায় কতটা নিগৃহীত হতে হয়েছে তাদের, কতটা প্রতিকূল অবস্থা পাড়ি দিতে হয়েছে; তার স্পষ্ট ছবি এঁকেছেন লেখক। এমনই এক পরিস্থিতিতে ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা প্রধান চরিত্র আশরাফকে সচেতন করছেন এই ভাবে, ‘হুঁশিয়ার থেকো ভুইয়া। তোমাকেও ধরবে। এদের কাছ থেকে সাবধানে থাকবে। তোমার আমার জন্মভূমি আর ওদের জন্মভূমি এক নয়। তোমাকে আমাকে ভাই হিসেবেও গণ্য করে না ওরা। যা বলে সব মুখে মুখে। ভিতরে অন্য কথা।’ ‘এক জীবনের গল্প’ বইটির প্রেক্ষাপট মূলত দেশভাগের পর থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা অর্জনের মাহেন্দ্রক্ষণ পর্যন্ত। তবে এই উপন্যাসকে ঐতিহাসিক বলা যায় না। উপন্যাসটির ভেতরে নানা স্পর্শকাতর তথ্য থাকলেও ক্ষণ ও জায়গা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না। উপন্যাসটি যত বিস্তৃত পরিসরে লেখা, তাতে পাঠকের কাছে এটির মূল্য অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু লেখকের ভাসা ভাসা বর্ণনায় তা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে আমার মনে হয়।