নিমতলী ট্র্যাজিডির শিক্ষা কি বৃথা যাইবে

এখনও বাতাসে কান পাতিলে নিমতলীর কান্না শোনা যায়। অনুভব করা যায় নারকীয় সেই অগ্নিকুণ্ডের আঁচ। ২০১০ সালের ৩রা জুন রাত্রে পুরান ঢাকার নবাব কাটারার নিমতলীতে সংঘটিত স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ সেই আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হইয়া প্রাণ হারাইয়াছিল ১২৩ জন নারী-পুরুষ ও শিশু। আহত হইয়াছিল অর্ধশতাধিক। ভস্মীভূত হইয়াছিল ২৩টি বসতবাড়ি, কারখানা ও দোকান। আর কতো সাজানো সংসার—কতো স্বপ্ন ধূলিসাত্ হইয়া গিয়াছিল চোখের পলকে—সেই হিসাব হয়তো কোনোদিনই জানা হইবে না। এই ট্র্যাজিডির জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল বহুতল আবাসিক ভবনের নীচে গড়িয়া তোলা রাসায়নিকের একটি গুদাম। পাশের বাড়িতে যখন বিবাহের উত্সব চলিতেছিল, সেই মুহূর্তে সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো গুদামটি অকস্মাত্ বিস্ফোরিত হইয়া দেশবাসীকে জানাইয়া দিয়াছিল যে, এই দেশে মানুষের জীবন কতো অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ। আর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা যাহাদের দায়িত্ব সেই প্রশাসন—সেই কর্তৃপক্ষ কতোটা উদাসীন তাহাদের কর্তব্যপালনে। ঘটনার ভয়াবহতাদৃষ্টে পর্বতপ্রমাণ শোকে, ক্ষোভে ও অপরাধবোধে সারাদেশ সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছিল। নীতিনির্ধারক মহলও বিশেষ গুরুত্বের সহিত গ্রহণ করিয়াছিলেন বিষয়টিকে। আশ্বাস দেওয়া হইয়াছিল ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের। জনগণও আশ্বস্ত বোধ করিয়াছিল। ইহার পর ইতিমধ্যে চারটি বত্সর অতিক্রান্ত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, নিমতলীর নরককুণ্ডও আমাদের চিরাচরিত মানসিকতায় তেমন প্রভাব ফেলিতে পারে নাই। সামগ্রিকভাবে হতাশার পাল্লাই যে ভারী তাহাতে সন্দেহ নাই। অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় জনগণের প্রবল প্রতিবাদের মুখে নিমতলী ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি এলাকা রাসায়নিকের বিপদমুক্ত হইলেও ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার বৃহদংশ জুড়িয়া এখনও অবাধে চলিতেছে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবসা। সোয়া কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই রাজধানীর বাদবাকি অংশের ছবিও যে খুব একটা ভিন্ন নহে—তাহাও সর্বজনবিদিত। তবে সমগ্র চিত্রটিই যে হতাশার তাহাও বলা যাইবে না। সর্বাপেক্ষা আশাব্যঞ্জক খবরটি হইল, পুরান ঢাকা হইতে রাসায়নিক গুদাম সরাইয়া লইবার উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। এই লক্ষ্যে প্রণীত হইয়াছে সহস্রাধিক কোটি টাকার বিশাল এক প্রকল্প। প্রকল্পের আওতায় কেরানীগঞ্জের সোনাকান্দায় ২০ একর জমির উপর একটি রাসায়নিক পল্লী গড়িয়া তোলার পরিকল্পনা রহিয়াছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১১ শত প্রতিষ্ঠানকে সেইখানে স্থানান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হইয়াছে। তবে প্রকল্পটি এখনও একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। আমরা আশা করি, অতি দ্রুতই তাহা সম্পন্ন হইবে। এই ধরনের বৃহত্ কাজ এমনিতেই সময়সাপেক্ষ। তদুপরি, উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার সমস্যা তো আছেই। তবে মূল সমস্যা এইখানে নহে। সমস্যার মূল নিহিত রহিয়াছে আমাদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ দায়িত্ববিমুখ মানসিকতায়—বহু বত্সর পূর্বে রবীন্দ্রনাথকেও যাহা প্রবলভাবে পীড়িত করিয়াছিল। এখন তাহাতে যুক্ত হইয়াছে দুর্নীতি নামক নূতন উপসর্গ। ফলে অনিয়ম নিয়মে পরিণত হইতেছে। আইনের বজ্র আঁটুনি পরিণত হইতেছে ফস্কা গেরোয়। ফলে সহজ কাজটিও জটিল হইতে জটিলতর রূপ পরিগ্রহ করিতেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি যে, সরকারকে কঠোর হইতে হইবে। আইন লঙ্ঘনকারীদের ব্যাপারে তো বটেই, সর্বোপরি যাহারা জনগণের জীবন লইয়া ছিনিমিনি খেলিতেও দ্বিধা করে না তাহাদের ব্যাপারে সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া গত্যন্তরও নাই। কিন্তু বেড়ায় যদি ক্ষেত খাইয়া ফেলে—সরকার কঠোর হইবে কী করিয়া? অতএব, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি হইতে শুরু করিয়া রাসায়নিকের ব্যবসা যাহারা করেন সকলেরই মানসিকতা বদলাইতে হইবে। কাজটি কে করিবে, কীভাবে করিবে—তাহা লইয়া তর্ক হইতে পারে। তবে মানসিকতা না বদলাইলে নিমতলীর সর্বগ্রাসী আগুন যে নিয়ত তাড়া করিতে থাকিবে এবং সেই আগুন হইতে আখেরে কেহই যে নিস্তার পাইবেন না—তাহাতে তিলমাত্র সন্দেহ নাই।