মিলেছে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপত্তা বাংকার
সমীর কুমার দে ও কামরুল ইসলাম, চুনারুঘাট (হবিগঞ্জ) থেকে
প্রকাশ : ০৫ জুন ২০১৪, ২৩:১১
হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে টিলায় এবার মিলল বালুর বস্তা দিয়ে বানানো বাংকার। র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত এ ধরনের বাংকার যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনী তৈরি করে। নিচে গর্ত করে চারদিকে বালুর বস্তা দিয়ে উঁচু করে ঘিরে রাখা হয় যাতে বাংকারে থাকা সৈন্যদের গায়ে গুলি না লাগে, তাছাড়া নির্বিঘ্নে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো যায়। এখানে পাওয়া বাংকারটি পরিত্যক্ত। গাছপালা ও লতাগুল্ম ঘিরে ধরেছে এটিকে। পাশেই মাটির ঘর-বাড়ির অস্তিত্ব মিলেছে। কখনও যে কেউ এখানে বসবাত করত তা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। র্যাবের গোয়েন্দারা ধারণা করছেন ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই এগুলো তৈরি করেছিল। এলাকাবাসীও বলছেন, এক সময় এখানে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর ব্যাপক তত্পরতা ছিল। তাদের অনেক নেতাও এখানে অবস্থান করেছে। তারা নিরাপত্তার জন্য বাংকার ব্যবহার করত।
র্যাব-৯ এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার পুলিশ সুপার শামীনুর রহমান গতকাল ঘটনাস্থলে ইত্তেফাককে বলেন, বালুর বস্তা নিয়ে বানানো পরিত্যক্ত বাংকার ও মাটির ঘর-বাড়ি দেখে মনে হচ্ছে এখানে এক সময় কেউ অবস্থান করেছে। তবে এই বাংকার সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ বা বিজিবির নয়। কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঘরের পাশেই বালুর বস্তা দিয়ে বাংকার করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এগুলো কতদিন আগের হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেখে মনে হচ্ছে ১০-১২ বছর আগের হবে। কারা করেছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বাংকার যেহেতু বাংলাদেশের কোন বাহিনী করেনি তাই কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী করতে পারে।
চলছে র্যাবের তল্লাশি অভিযান
শামীনুর রহমান বলেন, ‘ডগ স্কোয়াড’ ও ‘বোম ডিসপোজাল টিম’ ঢাকায় ফিরে গেলেও এখানকার র্যাব সদস্যরা তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। গতকালও দেখা গেছে র্যাব সদস্যরা নতুন বাংকার বা কূপের সন্ধানে পাহাড়ে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। গতকালও খোঁড়া হয়েছে চারটি গর্ত। তবে এগুলো থেকে কিছু পাওয়া যায়নি। শামীনুর রহমান বলেন, ‘ডগ স্কোয়াড’ ও ‘মেটাল ডিটেক্টর’ যে সব জায়গায় সিগন্যাল দিয়েছে সেসব জায়গা খুঁড়ে দেয়া হচ্ছে। নতুন কূপ বা বাংকারের সন্ধানে র্যাবের ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য সার্বক্ষণিক এই তল্লাশি চালাচ্ছে।
গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় দুই মামলা
চুনারুঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) অমূল্য কুমার চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় র্যাবের শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের ডিএডি শামিউল ইসলাম বাদী হয়ে চুনারুঘাট থানায় দু’টি মামলা করেছেন। এর একটি অস্ত্র ও অপরটি বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে। র্যাবের দায়ের করা এজাহারে বলা হয়েছে—‘দুষ্কৃতকারীরা’ কোন অপরাধ সংগঠনের জন্য পাহাড়ের উপর অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করেছিল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। র্যাবের শ্রীমঙ্গল ক্যাম্প কমান্ডার শামীনুর রহমান জানান, হবিগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের অনুমতি নিয়ে উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদ ঢাকার সেন্ট্রাল এমিউনিশন ডিপো ও সেন্ট্রাল অর্ডন্যান্স ডিপোতে পাঠানো হয়েছে।
ঘরে ফিরছে ‘টিপরা’ বস্তির বাসিন্দারা
গতকাল সরেজমিন পাহাড়ের টিলায় অবস্থিত ‘টিপরা’ বস্তিতে গিয়ে দেখা গেছে, দু-একটি ঘরে নারীরা ফিরেছেন। তবে কোন বাড়িতেই পুরুষদের পাওয়া যায়নি। যেসব নারী ঘরে ফিরেছেন তারাও কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। জ্যোতি দেব বর্মা নামের একজন নারী বললেন, ‘আগে যখন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর (অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্স—এটিটিএফ বা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা— এনএলএফটি) সদস্যরা আসত তখনও আমরা ভয়ে থাকতাম। এখন তারা আসে না, কিন্তু এখন ভয়ে থাকি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর।’ কি কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আপনারা ভয় পান— এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘পাশের পাহাড় থেকে উদ্ধার হয়েছে গোলাবারুদ, কিন্তু অনেকেই এখন আমাদের দোষ দিচ্ছে। আমরা তো এসব অস্ত্র গোলাবারুদের কিছুই জানি না। আমরা চা বাগানে কাজ করি, আর পুরুষরা বন পাহারা দেয়।’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এসে কি করত- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘জোর করে থাকতে চাইত, থাকতে না দিলে অস্ত্রের ভয় দেখাতো। আর জোয়ান ছেলেদের তাদের দলে যোগ দেয়ার জন্য চাপ দিত। এর বিনিময়ে অনেক টাকা-পয়সা দেয়ার লোভ দেখাতো। সে সময় অনেকেই টাকার লোভে হোক আর ওদের ভয়েই হোক দলে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু এখন আর তেমন কেউ নেই।’ এ সময় জ্যোতির পাশে আরো দু’জন নারী বসে থাকলেও তারা নিজেদের পরিচয় বা কোন কথা বলতে রাজি হননি। তাদের চোখে মুখে ছিল ভয়ের ছাপ।
১৯২২ সাল থেকে ত্রিপুরার বাসিন্দাদের ২২টি পরিবার এখানে বাস করতে শুরু করে। তা এখন বেড়ে ৪০ পরিবারের মতো হয়ে গেছে। অনেকে আবার এখান থেকে গিয়ে অন্য জায়গায় বাড়ি করে আছেন। এরা সবাই বাংলাদেশের ভোটার হয়েছেন।
এক সময় সীমান্ত ছিল ঢিলেঢালা, যাতায়াত ছিল চোরাকারবারী ও অস্ত্রধারীদের
হবিগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক মিলন রশীদ এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আপালকালে বললেন, ১২ কি ১৩ বছর আগের কথা। তখন সাতছড়ির বিশাল সীমান্তের অনেক স্থানেই কাঁটাতারের বেড়া ছিল না। তখন একদিকে চিমটিবিল ও অন্যদিকে সাতছড়ি বিওপি ছিল তত্কালীন বিডিআরের। এর মধ্যে দিয়ে অবাধে যাতায়াত করতো চোরাকারবারী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। তখন ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অনেকেই নির্বিঘ্নে যাতায়াত করত।
২০০৪ সালে র্যাব গঠনের পর শ্রীমঙ্গলে তত্কালীন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল গুলজারের নেতৃত্বে অভিযান চলে। সেই অভিযানে ৬ জন মারাও যায়। সেই থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তত্পরতা কমে। এরপর থেকে সীমান্তেও বিডিআরের টহল বেড়েছে। ফলে কমেছে চোরাকারবারী আর অস্ত্রধারীদের যাতায়াত।