সব কলেজ কেন ভালো নয়

২০১৪ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার রেকর্ড ফল সবাইকে আশ্বস্ত করলেও একটি আশঙ্কা ক্রমশ দানা বাঁধছে। আর তা হলো, পরীক্ষায় ভালো করা শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে কোথায়? প্রতি বছর পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকরা বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। শতভাগ পাস করা স্কুলগুলোর কথা ফলাও করে প্রচারিত হয় গণমাধ্যমে। কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ছবি ও সাক্ষাত্কারও প্রকাশিত হয়। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে এক ধরনের দুর্ভাবনায়ও তারা আক্রান্ত হয়। এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে বা ভালো ফল করলেই শেষ হয়ে যায় না শিক্ষাজীবন। পরের পর্বে অর্থাত্ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হতে হলে প্রবল প্রতিযোগিতামূলক একটি পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাদের। চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও মানসম্মত কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে অন্তত ৮০ হাজার শিক্ষার্থী। দেশের ১০ শিক্ষাবোর্ডে এ বছর জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছর এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৩১৩ শিক্ষার্থী। মাদ্রাসা বোর্ড ও কারিগরি বোর্ডে জিপিএ পেয়েছে যথাক্রমে ১৪ হাজার ১২ এবং ৫ হাজার ৯৫০ জন। সারা দেশে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ হাজার ৭৫৭টি। এর মধ্যে মানসম্মত কলেজের সংখ্যা মাত্র পৌনে দুই শ। এসব কলেজের আসন সংখ্যা ৫০ হাজারের মতো। ফলে অন্তত ৮০ হাজার শিক্ষার্থীকে কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থায় পড়তে হবে। ভালো ফল করেও মানসম্মত কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী প্রকারান্তরে এ বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন। বলেছেন, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর্যাপ্ত সুযোগ থাকলেও ভালো ফলাফলের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে সে হারে ভালো কলেজের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে গুটিকয়েক কলেজে ভর্তির জন্য ভিড় দেখা যায়। তাঁর মতে, ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে ভালো কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে সংকট দেখা দিতে পারে। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যারা ভালো ফল করেছে তাদের জন্য মানসম্মত কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ না পাওয়া নিঃসন্দেহে একটি হতাশার বিষয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা নিয়ে নৈরাজ্য চলছে। গুটিকয়েক বেসরকারি কলেজ ছাড়া সিংহভাগ কলেজের কোনো মান নেই। শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ায় যোগ্যদের বদলে অযোগ্যরাই এক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বিপরীতে পর্যাপ্ত কলেজ থাকলেও মানসম্মত কলেজের অভাব প্রকট। এ অভিজ্ঞতা থেকে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাবিদরা ভালো কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—পরীক্ষায় কৃতকার্যের হার বাড়ছে, ভালো ফল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু ভালো কলেজের সংখ্যা মোটেও বাড়ছে না। এ অবস্থায় বহু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ভালো কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। এজন্য বিদ্যমান কলেজগুলোর সংস্কার যেমন দরকার, তেমনি সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মানসম্মত কলেজের সংখ্যা বাড়ানোর দিকেও মনোযোগ কাম্য। ভালো ফল করা প্রত্যেক শিক্ষার্থী যাতে ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারে, সেদিকেই এখন মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী ঢাকা বিভাগে ৭০টি, রংপুর বিভাগে ২৯টি, বরিশাল বিভাগে ১২টি, খুলনা বিভাগে ১১টি, সিলেট বিভাগে ২২টি ও রাজশাহী বিভাগে ৫টি মানসম্মত কলেজ রয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা লোটাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যাঙের ছাতার মতো কলেজ গড়ে উঠলেও সেগুলোতে না আছে মানসম্মত শিক্ষক, না আছে শিক্ষা উপকরণসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা। ভর্তি সংকটের মোকাবিলায় চলতি বছর সম্ভব না হলেও আগামী বছর থেকে মানসম্মত কলেজগুলোতে দুটি শিফট চালুর বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। দেশে কলেজ-শিক্ষক হওয়ার মতো যোগ্য প্রার্থীর অভাব না থাকায় এ সমস্যার সমাধানে এটিই হতে পারে প্রকৃষ্ট উপায়। ঢাকা