আমাদের চলচ্চিত্র :এখন কী করা উচিত
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৪, ২১:১১
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রদর্শিত হয়ে দর্শক-সমালোচকদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে অনেক বছর আগেই। এ প্রসঙ্গে শেখ নিয়ামত আলী ও মসিউদ্দিন শাকের পরিচালিত ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ ছবির কথা বলতে হয়। এক সময় শিল্পশোভন মানসম্মত বক্তব্যপ্রধান চলচ্চিত্র নির্মিত হলোও বাণিজ্যিক ছবির প্রচণ্ড জোয়ারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে পড়েন মেধাবী চিত্রনির্মাতারা। বাণিজ্যিক ছবির নামে অশ্লীলতা রুচিহীনতা ভর করে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পে। সেই থেকে চরম বিপর্যয়ের সূচনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। সাধারণ শিক্ষিত ভদ্র রুচিশীল দর্শকও সিনেমা হলে যাওয়া ছেড়ে দেন। এভাবে ক্রমাগত লোকসানের কারণে সারা দেশে অগণিত সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে গত এক দশকে। সিনেমা হল ভেঙে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সুপার মার্কেট, শপিং মল, গার্মেন্টস কারখানা।
সিনেমা হলের সংখ্যা এখন যেখানে এসে পৌঁছেছে তাও পর্যাপ্ত দর্শকের অভাবে বন্ধ হওয়ার জোগাড়। বর্তমানে আমাদের এখানে যে সব মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা তৈরি হচ্ছে তা কোনোভাবেই দর্শকদের মন ভরাতে পারছে না। তাই বাংলাদেশে ভারতীয় সিনেমা প্রদর্শনীর মাধ্যমে সিনেমা হল ব্যবসা চালু রাখার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। প্রেক্ষাগৃহ ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন অসংখ্য মানুষ—প্রদর্শন ব্যবসার রমরমা অবস্থা বজায় না থাকলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলো যেমন চরম অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হন, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের পরিবারও দারুণ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যান খুব স্বাভাবিকভাবে। অতএব, বাধ্য হয়ে সিনেমা প্রদর্শন ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে দেশীয় বাংলা ছবির পাশাপাশি বিদেশি তথা ভারতীয় হিন্দি-বাংলা ছবি প্রদর্শন করতে হচ্ছে। হালে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে ভারতীয় ছবি ‘যুদ্ধশিশু’। প্রচলিত বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা না হলেও এ ছবিটি বাংলাদেশের অগণিত সিনেমা দর্শককে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নির্মিত এ ছবিটি প্রশংসা পেয়েছে তাঁদের। সিনেমাশিল্প যেখানে নানা বৈচিত্র্যে আর চমকে পরিপূর্ণ হয়ে বিনোদনের ভিন্ন মাত্রা নিয়ে দর্শকদের আন্দোলিত, চমকিত ও শিহরিত করে, সেখানে বাংলাদেশের তথাকথিত ডিজিটাল সিনেমা দর্শকদের কেবলই প্রতারিত করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গেজেটে প্রকাশিত নীতিমালায় রয়েছে— ‘রফতানির বিপরীতে সাফটাভুক্ত দেশ থেকে সমান সংখ্যক চলচ্চিত্র আমদানি ও প্রদর্শন করা যাবে।’ এই গেজেট মোতাবেক বাংলাদেশের কয়েকটি ছবি ভারতে রফতানির বিপরীতে ভারতীয় কয়েকটি সিনেমা আমদানি করে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন এ ছবিগুলো সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনা বাধায় বাংলাদেশে মুক্তি পেয়ে যাবে। এভাবেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা ছবি প্রদর্শনের ব্যাপারটি ক্রমেই আরো উন্মুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ৪০ বছর পর এ দেশে ভারতীয় সিনেমার বাজার উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞমহল মনে করছেন।
বিশ্বায়ন আর আকাশ সংস্কৃতির যুগে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে এখন থেকে প্রচণ্ড প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। এতোদিন যাচ্ছেতাই মানের ছবি বানিয়ে দর্শকদের ধোঁকা দিয়েছেন এদেশের এক শ্রেণির চিত্রনির্মাতা। তাঁরা যা নির্মাণ করেছেন সেই অখাদ্য কুখাদ্য বাংলা সিনেমা দর্শকদের বাধ্য হয়ে গিলতে হয়েছে। এখন আর আগের সেই অবস্থা নেই। এবার সরাসরি ভারতীয় হিন্দি ও বাংলা সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে এখানকার বাংলা ছবিকে। প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হওয়ায় এবার আমাদের চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের মধ্যে বোধোদয় ঘটবে হয়তোবা। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে অবশ্যই উন্নতমানের আধুনিক প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে ছবি তৈরি করতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক মনোবৃত্তি নিয়ে ছবি নির্মাণ হলে এদেশের ছবির মান ভালো হবে অবশ্যই।
ভারতীয় হিন্দি ছবির বাজার বিশ্বব্যাপী হওয়ায় তাদের ছবি নির্মাণ বাজেট থাকে আকাশ ছোঁয়া। কলকাতার বাংলা সিনেমাও গত বেশ ক’বছর ধরে সে পথ ধরে হাঁটছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের সিনেমার আন্তর্জাতিক বাজার নেই। বাংলাদেশের বাজারেই সীমাবদ্ধ হওয়ায় এখানে বড় অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করেন না সাধারণত প্রযোজকরা। কম বাজেটে নির্মিত দুর্বল, নিম্নমানের এখানকার ছবিগুলো আজকাল দর্শক প্রত্যাখ্যান করছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে কী করা প্রয়োজন? তেমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে চলচ্চিত্র-কর্মী, বোদ্ধা এবং এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে। এখন কী করা উচিত, কী করতে হবে, কীভাবে কী করলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প বাঁচবে—এটা দেখার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবার। এ বিষয়ে সরকার ও চলচ্চিত্রশিল্পের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, শীর্ষস্থানীয় চলচ্চিত্র সাংবাদিক, চলচ্চিত্র বোদ্ধা, শিল্পী কলাকুশলীদের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। এবং সেই নীতিমালা যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে উন্নতমানের দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য সিনেমা নির্মাণ, আমদানি, রফতানি এবং প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প শুধু বাঁচবেই না, তার হারানো অতীত ঐতিহ্য আর গৌরবও ফিরে পাবে। আমাদের সংস্কৃতির উপযুক্ত বিকাশ এবং পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে সবাইকে সিরিয়াসলি মাঠে নামতে হবে। এক্ষেত্রে বিলম্ব এবং গাফিলতি আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের ধ্বংস ডেকে আনবে শুধু। যার অশুভ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের গোটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল।
ঢাকা