নাইক্ষ্যংছড়িতে ফের বিজিপির গুলি
রফিক উদ্দিন বাবুল, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ০৬ জুন ২০১৪, ২২:৫৭
মিয়ানমারের মংডু শহরে বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কার্যালয়ে বাংলাদেশের বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং শান্ত রাখার লক্ষ্যে আলোচনা হলেও মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী কথা রাখেনি। গতকাল শুক্রবার ভোররাতেও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের পর্দানঝিরির ওপারে মিয়ানমারের ছালিদং এলাকায় টহল দেয়ার সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী কোন কারণ ছাড়াই বাংলাদেশের দিকে গুলি বর্ষণ করেছে। বিজিপি সদস্যরা গ্রামে গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে লোকজনদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সীমান্তে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা রোহিঙ্গাদের আবারো বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে বলে সেখানে বসবাসরত একাধিক রোহিঙ্গা মোবাইল ফোনে জানিয়েছেন।
গত ২৮ মে সীমান্তের পাইনছড়ি এলাকায় নিয়মিত টহল দানকালে বিজিপি বিনা উস্কানিতে গুলি করে ওই ক্যাম্পের নায়েব সুবেদার মিজানুর রহমানকে হত্যা করে। পরে তাকে অস্ত্রসহ টেনে হেঁছড়ে ওপারে নিয়ে যায়। ৩০ মে বিজিপির পক্ষ থেকে নিহত মিজানুরের লাশ ফেরত দেয়ার কথা বলে বিজিবি সদস্যদের সীমান্ত এলাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে বিজিপি ফের গুলি বর্ষণ করলে পুরো সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠে।
এ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের মংডু শহরে বিজিবি ও বিজিপির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষের মধ্যে সীমান্তে বিদ্রোহী দমন ও অস্ত্রধারীদের গ্রেফতার করা, উভয় দেশের সীমান্তরক্ষীর সাথে সেনাবাহিনীর যৌথ টহল, মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে অসামরিক সদস্যদের অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ, সীমান্তে সমন্বিত টহল বলবত্ রাখা, অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন, উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ব্যবহূত ইউনিফর্ম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ও যথাযথ পতাকা ব্যবহার করে টহল দান নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।
পতাকা বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবি’র ২৩ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন, বিজিবির কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খোন্দকার ফরিদ হাসান। সাথে ছিলেন, বিজিবি বান্দরবান সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এ কে এম সাইফুল ইসলাম, নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিকুর রহমান, রামুর ৫০ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল তইয়ুমুর সালাহউদ্দীন কায়কোবাদ, কক্সবাজারের ১৭ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম, টেকনাফ ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর নাজমুল সাদাত সৌম্যসহ পদস্থ কর্মকর্তারা। মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠকে মিয়ানমারের ১৫ সদস্যের নেতৃত্ব দেন মংডুস্থ বিজিপি ডাইরেক্টর বিগ্রেডিয়ার থিন কো কো। বৈঠকে নিহত বিজিবি সদস্য মিজানুর রহমানের লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দিয়েছে মিয়ানমার।
ওই বৈঠকের মাত্র ১২ ঘণ্টা পর মিয়ানমারের বিজিপি পর্দানঝিরি এলাকায় বাংলাদেশ ভূখন্ড লক্ষ্য করে গুলি করেছে। ৩৮ নম্বর সীমান্ত পিলার থেকে ৪৫ নম্বর সীমান্ত পিলারের জিরো লাইনে দুই শতাধিক বিজিপি সদস্যকে গতকাল সকালে টহল দিতে দেখা গেছে বলে মিয়ানমার বলিবাজার গ্রামের বাসিন্দা আবদুস শুক্কুর (৩৫) মোবাইলফোনে জানিয়েছেন। তিনি জানান, বিজিপি সদস্যরা গ্রামে গ্রামে তল্লাশি চালিয়ে রোহিঙ্গা যুবকদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাচ্ছে এবং সীমান্ত এলাকায় টহলদানকালে ওই সব যুবকদের বিজিপির সঙ্গে মালামাল বহনকারী হিসেবে রাখা হয়েছে। যে কোন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে ওই সব রোহিঙ্গা যুবকদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। বিজিপির অত্যাচার, উত্পীড়নের ফলে ওই সব রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে যে কোন সময়ে বাংলাদেশে চলে যেতে হবে বলে তারা আশংকা করছেন।
নাইক্ষ্যংছড়ি ৩১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিকুর রহমানের কাছে পর্দানঝিরি এলাকায় গুলি বর্ষণের ঘটনার ব্যাপারে জানতে চাইলে এ ধরনের খবর তার জানা নেই বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। সীমান্তের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে সীমান্তে নিয়োজিত একটি সরকারি দায়িত্বশীল সূত্র গুলি বর্ষণের সত্যতা স্বীকার করেছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৯১ সালের শেষের দিকে তত্কালীন নাসাকা বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে নাইক্ষ্যংছড়ির রেজুপাড়া বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। ওই সময় ঘটনাস্থলে একজন বিডিআর সদস্য নিহত হয়। পরে উভয় দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বৈঠকের মাধ্যমে লুণ্ঠিত অস্ত্র ফেরত দিলেও সে দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচার উত্পীড়ন চালিয়ে এ দেশে ঠেলে দিয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।