পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আরো আস্তানার সন্ধান

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে পাহাড়ের টিলাগুলোতে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আরো আস্তানার সন্ধান মিলেছে। এর মধ্যে সদ্য ব্যবহার করা আস্তানাও পাওয়া গেছে। যদিও র্যাব শুধু অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হওয়া পাহাড়টি ঘিরে রেখেছে। আশপাশের পাহাড়গুলোতে এখনো সেভাবে তল্লাশী শুরু করেনি। র্যাব-৯ এর শ্রীমঙ্গল ক্যাম্পের কমান্ডিং অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সানা শামীনুর রহমান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘কাল (আজ শনিবার) থেকে আমরা আরো বৃহত্ পরিসরে আশপাশের পাহাড়গুলোতে তল্লাশী অভিযান শুরু করব। আমাদের কাছে কোন তথ্য এলে তা নিয়ে তল্লাশী অভিযান চালাচ্ছি।’ গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই দিন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ভেতরে কয়েকটি পাহাড় ঘুরে দেখা গেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বেশ কয়েকটি পরিত্যক্ত ক্যাম্প পড়ে আছে। যদিও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার হওয়া পাহাড়ের পাশের একটি পাহাড়ে নতুন নির্মিত একটি ঘর দেখা গেছে। ওই ঘরে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরটি দেখে মনে হয়েছে, অল্প কিছুদিন আগেও এখানে কেউ বসবাস করেছে। র্যাবের অভিযান শুরু হওয়ার পর তারা পালিয়ে গেছে। ওই এলাকার একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ২০০৩ সালে বগুড়ার কাহালুতে উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদের প্রধান হোতা আশীষ দেব বর্মার বাড়ি এখানের ‘টিপরা’ বস্তিতে। ওই ঘটনার পর আশীষের প্রকাশ্যে আর দেখা মেলেনি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও তাকে খুঁজে পায়নি। কিন্তু এলাকার লোকজন আশীষকে মাঝে মধ্যেই এই পাহাড়ে দেখতে পেয়েছেন। লোকজন নিয়ে রাতও কাটিয়েছেন। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে এসে রাতেই আবার পালিয়ে যান। তবে ‘টিপরা’ বস্তির বাসিন্দারা বলছেন, ২০০৩ সালের পর আশীষ আর এই বস্তিতে আসেনি। আশীষের মা খ্যামতি দেব বর্মা ইত্তেফাককে বলেছেন, ছেলের সঙ্গে গত ১০/১১ বছরে তার দেখা হয়নি। বাড়িতেও সে আসেনি। অন্য পাহাড়ে রাতের আঁধারে আসে কি-না তা খ্যামতি জানেন না বলে জানান। তার অন্য দুই ছেলের সঙ্গেও আশীষের কোন যোগাযোগ নেই বলেই দাবি তার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ‘টিপরা’ বস্তির বাসিন্দাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে। তবে কেউ কেউ ঘরে ফিরেছেন। তারা কোন কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন। র্যাবের শ্রীমঙ্গল ক্যাম্প কমান্ডার শামীনুর রহমান বলেন, অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। এই ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে শুধু তাদেরই গ্রেফতার করা হবে। সাধারণ বাসিন্দাদের এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই। যারা কোন অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয়, তারা নির্বিঘ্নেই বাড়িতে আসতে পারেন, ভয়ের কোন কারণ নেই। দুই দিন সাতছড়ি পাহাড়ের কয়েকটি টিলা ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য বালুর বস্তা দিয়ে বানানো বাংকার। পরিত্যক্ত ঘরবাড়ির আলামত। যেগুলোতে এখনো অভিযান চালায়নি র্যাব। বানরের অবাধ বিচরণক্ষেত্র এই পাহাড়ে ঢুকলেই গা শিউরে উঠে। বানরগুলো যেভাবে আশপাশে চলে আসে তাতে মনে হয়, ওদের আস্তানায় ঢুকে পড়ায় এখনই ওরা হামলা চালাবে। এর মধ্যেই পাহাড়গুলো ঘুরে মনে হয়েছে, এক সময় এই পাহাড়গুলোতে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অভয়ারণ্য ছিল। স্বাধীনভাবে তারা ঘর বেঁধেছে, বানিয়েছে বালুর বস্তা দিয়ে বাংকার। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে একটা পর্যায়ে তারাই বাড়িঘর ও বাংকার ফেলে পালিয়ে গেছে। বনের মধ্যেই একজন বনরক্ষী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘৭/৮ বছর আগেও সাতছতি বনের ভেতরের প্রধান রাস্তার দক্ষিণ দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ যেতে সাহসই পেতেন না। ফলে ওরা স্বাধীনভাবে যেমন চেয়েছে তেমনই ঘরবাড়ি, আস্তানা বানিয়েছে। এখন সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে।’ সম্প্রতি তাদের আনাগোনা আছে কি-না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আগের মতো এখন আর আসে না। মাঝে মধ্যে দু’-একজন রাতের আঁধারে এসে রাতেই চলে যায়। সে কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরতে পারে না।’ ওই বনরক্ষীর দাবি, এক সপ্তাহ ফাঁদ পাতলেই অন্তত ১০ জন বিচ্ছিন্নতাবাদীকে ধরা যাবে। এর মধ্যে আশীষ দেব বর্মাকেও পাওয়া যেতে পারে। পরিবারের সঙ্গে এখনো আশীষের যোগাযোগ আছে এমন দাবি করে ওই বনরক্ষী বলেন, এই এলাকার মধ্যেই আশীষ ঘুরে বেড়ায়। রাতের আঁধারে বাড়িতে আসে। বন বিভাগের সাতছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ অফিসার মনির আহমেদ খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘সাম্প্রতিককালে বনের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওভাবে দেখা যায় না। তবে রাতের আঁধারে কেউ আসে কি-না তা আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। কারণ গহীন বনে রাতে থাকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। বিজিবি থাকে দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে সীমান্তে আর রাস্তার দিকে তেমন কেউ থাকেন না। ফলে রাতে কি হয়, তা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।’