বাজেটোত্তর সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

বাজেট বাস্তবায়নে ছাড়তে হবে রাজনৈতিক সহিংসতা

আড়াই লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়নে সহিংসতামুক্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বজায় রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। চলতি অর্থবছরের বড় সময়জুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়েছে তা জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী সময়কালে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। আর এ জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। গতকাল বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী একথা বলেন। বাজেট বক্তৃতায়ও তিনি উল্লেখ করেছেন, হরতালে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের পরিপূরক নীতি, সহায়তা বিনিয়োগ ও রপ্তানি খাতে উত্সাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। ফলে অনুকূল আবহাওয়া আর ধারাবাহিক নীতি ও উপকরণ সহায়তার ফলে ভালো প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। কালো টাকা সাদা নয় আসছে বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘দেশে কেউ কালো টাকার ঘোষণা করে না, এটি বন্ধ করা হবে। গতবছর মাত্র ৩৪ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করা হয়েছে- এর মানে হলো দেশে কালো টাকা নেই!’। গতকাল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী একথা বলেন। প্রাক বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রহিত করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিলেও বৃহস্পতিবার ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কিছুই উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গতকাল তিনি বলেন, ‘এটি খেয়াল করিনি, এটা এ মুহূর্তে বন্ধ করা হলো’। তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে কালো টাকার উত্স হলো জমি। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া যে পদ্ধতিতে হয় তাতে বহু কালো টাকার জন্ম হয়। দেশে কালো টাকার পরিমাণ মোট দেশজ আয়ের ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মতো, এর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে একটি সমীক্ষা করা হচ্ছে। কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন গতকাল বলেন, মোট তিনটি খাতে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ ছিলো। এগুলো হলো রিয়েল এস্টেট খাত, ট্রেজারি বন্ড ক্রয় এবং ১০ শতাংশ জরিমানা। শেয়ার বাজারে এ সুযোগ ছিলো না। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এ সুযোগ বন্ধ করা হবে। সাংবাদিক সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর ড. আতিউর রহমান, অর্থসচিব ফজলে কবীর, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ভূঁইয়া শফিকুল ইসলাম। বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, উচ্চাভিলাষ যদি বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে, সেটিই ভালো। প্রথম থেকেইে আমি উচ্চাভিলাষী বাজেট দিয়ে আসছি। ৫ বছরে ব্যয় করার সামর্থ্য দ্বিগুণ হয়েছে, এটাই এ সরকাররে বৈশিষ্ট্য। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা অবশ্যই রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবো। কারণ আগের প্রতি বছর আমরা সেটা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছি। শুধু গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমাতে হয়েছে। কিন্তু এবার আর সমস্যা হবে না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এ বাজেটকে ‘লক্ষ্যবিলাসি বাজেট’ উল্লেখ করেছে, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন ‘নো কমেন্ট’, তাদের মন্তব্যকে কোনো মন্তব্য বলে মনে হয় না। সিপিডি প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এমন বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে অর্থমন্ত্রী বলেন, জিডিপি’র হিসাব খুব সহজ নয়, সিপিডি’র অভিযোগ অত্যন্ত অন্যায্য, আমরা তথ্যের উপর পোদ্দারী করতে বসিনি, সিপিডি যা বলেছে তা অত্যন্ত অন্যায় অভিযোগ’। বাজেটে ঘাটতির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোর বাজেট ঘাটতি জিডিপি’র ৫ শতাংশের মধ্যে ছিলো, এবারও তাই থাকবে। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংকের উপর নির্ভরতা বাড়ছে, ফলে বেসরকারি ঋণ প্রভাহ কমবে এমন বক্তব্যের বিষয়ে গভর্ণর ড. আতিউর রহমান জানান, এপ্রিল পর্যন্ত আমাদের বেসরকারি ব্যাংক ঋণের হার ১১.৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বৈদেশিক ঋণসহ হিসাব করলে এ ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬.২ শতাংশ হবে। অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে পাইপলাইনে বৈদেশিক ঋণের আকার ১৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, এগুলো ব্যবহারে দুর্বলতা রয়েছে। তবে বাজেট বাস্তবায়ন বৃদ্ধির সাথে সাথে এর পরিমাণ কমে আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের জন্য দুই লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকার বাজেট সংসদে উপস্থাপন করনে। রেওয়াজ অনুযায়ী বাজেট উপস্থাপনের পরদিন আনুষ্ঠানিক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হলো। করমুক্ত আয়ের সীমা করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন. আমাদের দেশে যেভাবে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে তা বিশ্বের কোন দেশে হয়নি। করমুক্ত আয়ের সীমা ২ লাখ ২০ হাজার টাকা আগামী ১০ বছরের জন্য নির্ধারণ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর আপত্তির কারণে তা সম্ভব হয়নি। মোবাইল সেটে কর আমদানিকৃত মোবাইল সেটের উপর কর আরোপের বিষয়টি যৌক্তিক দাবি করে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মোবাইল সেট যে কর বসানো হয়েছে তাতে কেউ আপত্তি করবেন না বলে আমার ধারণা। এনবিআর চেয়ারম্যান বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, দেশীয় মোবাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১৫ শতাংশ হারে কর ছিলো যা আমদানিকৃত মোবাইলসেটে ছিলো না। সমতা আনতে এবার আমদানিকৃত মোবাইলে কর আরোপ করা হয়েছে। সহিংসতা পরিহার করতে হবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক সহিংসতা আমাদের পরিহার করতে হবে “এটি দুষ্টু কালচার। রাজনীতিবিদরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা এ ব্যাপারে শুধু আপিল করতে পারি।” বাড়িভাড়া সংগ্রহে বিধিমালা এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন জানিয়েছেন, বাড়ি ভাড়া কিভাবে সংগ্রহ করা হবে, কিভাবে ব্যাংক হিসাব খোলা হবে তা বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ২৯ তারিখ বাজেট অনুমোদনের সাথে বিষয়টি অনুমোদন হলে এর মধ্যেই এ বিধিমালা তৈরি করা হবে। উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ হাজার টাকার উপরে বাড়ি ভাড়া হলে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পেয়েছি মতিয়া চৌধুরী চলতি অর্থবছরে চাহিদা অনুযায়ী কৃষি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, “কৃষিতে বাজেট কমানোর কোনো কৃপণতা সরকারের নেই, যা চেয়েছি তাই বরাদ্দ পেয়েছি।” কৃষিমন্ত্রী বলেন, এ সরকারের আমলে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। কৃষি ঋণের সুদহার ৮ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে সাফল্যও এসেছে। যেমন, পাটের জীবন রহস্য উন্মোচন হয়েছে, বিটি বেগুনের জাত, খরা ও জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিরোধীদলের আন্দোলনের সময়কালে হরতাল-অবরোধে কৃষির ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কৃষকদের কাছ থেকে আলু গ্রাহক পর্যায়ে না পৌঁছায় এ সময় আলু পচে নষ্ট হয়েছে। সেসব ছবি তুলে ছাপানোয় সাংবাদিকদের ধন্যবাদ দেন তিনি। দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমেছে- তথ্যমন্ত্রী ইনু তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, ক্ষমতায় আসার পর থেকে বৈষম্য কমানো এবং প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্য সরকারের রয়েছে। ২০০৮ সালের পর সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশে বৈষম্য কমানো যা সরকার সাফল্যের সঙ্গে করে এসেছে। কারণ ২০০৮ সালের তুলনায় দেশে দরিদ্র এবং অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে। মন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের পরে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩ কোটি আর চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৮৮ লাখ থেকে কমে ১ কোটি ৫০ লাখে দাঁড়িয়েছে। তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, বিগত খালেদা জিয়ার সরকার দেশের অর্থনীতিকে মুক্তবাজারের কাছে ইজারা দিয়েছিল যা থেকে দেশের অর্থনীতিকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। ফলে দেশে বৈষম্য কমেছে। এছাড়া ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে বর্তমান সরকার গ্রামের স্কুলে কম্পউটার ল্যাব করে দিচ্ছে। বর্তমানে ৪ কোটি ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে।