সাংবাদিক মাহবুবুল আলম আর নেই

দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার সাবেক সম্পাদক ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুল আলম আর নেই। গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর বারডেম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৯ বছর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত মঙ্গলবার তিনি বারডেম হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরে মাহবুবুল আলম লিভারে প্রদাহ, ডায়াবেটিস, বার্ধক্যজনিত রোগসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও তিন মেয়েসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় মাহবুবুল আলমের বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবন এবং দেশের সাংবাদিকতার উন্নয়নে তার অবদানের কথা গভীরভাবে স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী এক শোক বাণীতে বলেন, সাংবাদিকতায় বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার অধিকারী প্রথিতযশা এই সম্পাদকের অবদান সংবাদপত্র জগত্ গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে। বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ আজ একজন দক্ষ সাংবাদিককে হারালো। তার অব্যাহত কর্মপ্রয়াস ও দায়িত্ব পালন সকলের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, মাহবুবুল আলম ছিলেন একজন নির্ভীক, স্পষ্টভাষী, সমাজ ও রাজনীতি সচেতন সাংবাদিক। তার কর্ম পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এক শোক বাণীতে বলেন, মাহবুবুল আলমের ক্ষুরধার লেখনী এবং সত্য ও সাহসীউচ্চারণ তাকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম এক বিবৃতিতে প্রবীণ সাংবাদিক মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, তার মৃত্যুতে জাতি সাংবাদিক জগতের একজন পুরোধাকে হারালো। জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এছাড়া জেপি’র অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে নিউজ পেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) শোক জানিয়েছে। নোয়াবের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মতিউর রহমান এক বিবৃতিতে এই শোক প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের সাংবাদিকতা জীবনে তার অগ্রণী ভূমিকা জাতি চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। বিশেষ করে নোয়াবের সভাপতি হিসেবে তিনি সংবাদপত্রের বিকাশ ও সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষায় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমাদের ভবিষ্যত্ চলার পথে নিত্য প্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, মাহবুবুল আলম তার দীর্ঘ জীবনে সাংবাদিকতা পেশার বাইরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে তার বিশেষ ভূমিকাও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা মাহবুবুল আলমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করছি। বরেণ্য এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে সম্পাদক পরিষদের পক্ষে সভাপতি গোলাম সারওয়ার ও সাধারণ সম্পাদক মাহফুজ আনাম এক বিবৃতিতে বলেন, মাহবুবুল আলম ছিলেন সাংবাদিকদের অভিভাবক তুল্য। তার ৫০ বছরের দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন ছিল বর্ণাঢ্য। নোয়াবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে তিনি এ শিল্পের মর্যাদা সমুন্নত রেখে সমস্যা সমাধানে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ পৃথক বার্তায় শোক জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আআমস আরেফিন সিদ্দিক সাংবাদিক মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামালউদ্দিন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ মাহবুবুল আলমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এদিকে, মাহবুবুল আলমের ভাগ্নে ও ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার সহকারী সম্পাদক সৈয়দ মেহেদী মোমেন বলেন, মাহবুবুল আলমের মরদেহ বারডেম হাসপাতাল থেকে প্রথমে গুলশানে তার ছোট ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বাদ আসর গুলশানের আজাদ মসজিদে মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন। জানাজা শেষে তার লাশ ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মাহবুবুল আলম জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য ছিলেন। মেহেদী মোমেন বলেন, মাহবুবুল আলমের স্ত্রী ও তিন মেয়ে (মহুয়া আলম, হিজল আলম ও পাপিয়া আলম) বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তারা দেশে ফিরলে দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। জীবনী মাহবুবুল আলম ১৯৩৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। দীর্ঘ ১৮ বছর তিনি ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছিলেন ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের তথ্য উপদেষ্টা। ভুটানের রাষ্ট্রদূত, নিউজ পেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৫৭ সালে সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটস প্রেস অব পাকিস্তানে (এপিপি) কাজের মধ্য দিয়ে তার সাংবাদিকতার শুরু। কর্মজীবনে নিউ নেশন (১৯৮৬-১৯৮৭), সাপ্তাহিক ডায়ালগের সম্পাদক (১৯৯২-১৯৯৫) ছিলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। প্রবীণ এই সাংবাদিক লন্ডন হাই কমিশন ও ওয়াশিংটন দূতাবাসের বার্তা বিভাগে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। মাহবুবুল আলম পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহির্বিশ্ব বিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন। অতীশ দীপঙ্কর স্বর্ণ পদকসহ বিভিন্ন সম্মাননাও পেয়েছেন মাহবুবুল আলম।