গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট ভরবেগ পর্ব— ৯ সকালের নাস্তার টেবিলে ব্রেকফাস্ট করছেন সবাই। নীলকান্তবাবু বললেন— কমলা, চা দাও। অফিস যেতে হবে, তাড়াতাড়ি করো। স্পিড বাড়িয়ে দাও। চন্দ্রা বললো— স্পিড মানে কী মামা ? নীলকান্তবাবু বললেন— স্পিড মানে হলো দ্রুতি, একক সময়ে তুমি যতটুকু যেতে পারো। ধরো তুমি পাঁচ সেকেন্ডে দশ মিটার দৌঁড়ে গেলে। তাহলে এক সেকেন্ডে কতটুকু গেলে ? চন্দ্রা বললো— দুই মিটার। তাহলে দ্রুতি হলো প্রতি সেকেন্ডে দুই মিটার। স্পিড বা দ্রুতি মানে এক সেকেন্ডে কোনো বস্তু কত দূরে যায়। এর এসআই একক হলো মিটার পার সেকেন্ড। নীলকান্তবাবু বুঝাতে লাগলেন, সিজিএস পদ্ধতিতে স্পিডের একক সেন্টিমিটার পার সেকেন্ড এবং এফপিএস পদ্ধতিতে ফুট পার সেকেন্ড। আকাশ বললো— বুঝেছি, কোনো বস্তু কতো দ্রুত চলাচল করতে পারে তা-ই দ্রুতি। চন্দ্রা বললো— মামা, আমরা কক্সবাজার থেকে চিটাগাং আসার সময় গাড়ি খুব দ্রুত চালিয়ে এসেছে। যাত্রীরা সবাই ড্রাইভার সাহেবকে অনুরোধ করেছে— আস্তে চালান, আস্তে চালান। ড্রাইভার চাচ্ছিলেন কম সময়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে। বললেন নীলকান্তবাবু। তখন সবাই বলছিলো ড্রাইভার নাকি নব্বই কিলোমিটার স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন —বললো আকাশ। নব্বই কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায় চালাচ্ছিলেন মানে স্পিড ছিলো নব্বই কিলোমিটার পার আওয়ার। কিন্তু তুমি তো বললে এর একক মিটার পার সেকেন্ড। কিলোমিটারকে এক হাজার দিয়ে গুণ করলে মিটার, আর ঘণ্টাকে তিন হাজার ছয়শ দিয়ে গুণ করলে সেকেন্ড হয়ে যাবে। তখন নব্বই হাজার মিটারকে তিন হাজার ছয়শ সেকেন্ড দিয়ে ভাগ করা হলে ক্যালকুলেটরে হিসাব করে বললেন নীলকান্তবাবু— স্পিড হবে টুয়েন্টি ফাইভ মিটার পার সেকেন্ড। বুঝলি তো ? চন্দ্রা বললো— বুঝলাম। কিন্তু নব্বই কিলোমিটার স্পিড, এটি কোন একক মামা ? এটি হলো ব্যবহারিক একক। কোনো কোনো বিষয় রয়েছে, যেগুলো আমরা এসআই বা সিজিএস বা এফপিএস এককে পরিমাপ না করে আমাদের সুবিধামতো যে কোনো এককে পরিমাপ করি। একে বলি ব্যবহারিক একক। যেমন দূরত্বের জন্য কিলোমিটার। সময়ের জন্য ঘণ্টা। একটু পরিষ্কার করে বুঝাও মামা। যেমন ধর, তিনটি পদ্ধতিতেই সময়ের একক হলো সেকেন্ড। কিন্তু আমরা সেটি বলি না। ঢাকা থেকে সিলেট বাসে যেতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টা। আমরা কি বলি এতো সেকেন্ড? না, বললো চন্দ্রা। বলি না, ঘণ্টা বলি। কারণ এটি ব্যবহারিক এককে বলতে সুবিধা। এরজন্যই তোদের গাড়ির যাত্রীগণ বলেছে গাড়ি নব্বই কিলোমিটার স্পিডে চালানো হয়েছে। নব্বই কিলোমিটার স্পিড মানে হলো প্রতি ঘণ্টায় নব্বই কিলোমিটার যাবে। তবে ড্রাইভার এতো রিস্ক নিয়ে গাড়ি না চালালেই পারতো। হ্যাঁ, মামা। আমাদের ভীষণ ভয় করছিলো, গাড়িটা যদি উল্টে যায়। তবে কোনো সরু রাস্তা বা নড়বড়ে ব্রিজে উঠার সময় স্পিড কমিয়ে ফেলেছে। বললো চন্দ্রা। সেটি কেনো করলো বলতে পারিস ? জিজ্ঞেস করলেন নীলকান্তবাবু। না তো ! সেটি আরেকটি কারণ, ভরবেগ। ভরবেগ আবার কী ? বললো আকাশ। নীলকান্তবাবু বললেন— ভর তো বুঝিস ? বেগও বুঝিস। বুঝেছি— বললো আকাশ। ভর আর বেগ মিলে ভরবেগ। ঠিক তাই। ভর আর বেগের সমন্বয়ে ভরবেগ। এই দুটোর গুণফল দিয়ে ভরবেগ পরিমাপ করা হয়, নীলকান্তবাবু বললেন। কিন্তু এর কী প্রভাব, দুর্বল ব্রিজে আস্তে গাড়ি চালাতে গিয়ে এর কী সুবিধা ? আগে ভরবেগটা ভালো করে বুঝে ফেল। বললেন নীলকান্তবাবু। ধর দুটো বাইসাইকেল দৌঁড়াচ্ছে। একটির স্পিড বেশি, অন্যটির কম। এখন কোথাও ধাক্কা লাগলে কে বেশি আঘাত পাবে ? সীমা বললো— এটা তো বোঝাই যায়, যে বেশি দ্রুত দৌঁড়াচ্ছিলো সে। ঠিক তাই। বললেন নীলকান্তবাবু। দুটোর ভর কিন্তু সমান। তাহলে কে বেশি আঘাত পেলো ? যার বেগ বেশি, সে। আবার ধর একটা মোটরসাইকেল, আরেকটা বাইসাইকেল সমান বেগে দৌড়াচ্ছে। এখন ধাক্কা লাগলে কে বেশি আঘাত পাবে ? কণিকা বললো— যে মোটরসাইকেল চালাচ্ছে সে বেশি ব্যাথা পাবে। কেন ? কারণ মোটরসাইকেলের ভর বেশি। ঠিক বলেছিস। বললেন নীলকান্তবাবু। তাহলে এখন বেগ সমান কিন্তু ভর ভিন্ন। আমরা দেখলাম প্রথম ক্ষেত্রে ভর সমান, স্পিড ভিন্ন হওয়ায় আঘাত দুইরকম হয়েছে। বেশি স্পিডে চললে বেশি আঘাত। আবার দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখলাম স্পিড সমান, কিন্তু ভর বেশি হওয়ায় আঘাত বেশি হয়েছে। কাজেই ভর আর বেগ মিলে একটা আলাদা রাশির সৃষ্টি হয়। একেই বলি ভরবেগ। ও, বুঝেছি। বললো আকাশ। এরজন্যই নড়বড়ে ব্রিজে উঠলে স্পিড কমিয়ে দেয়। কম স্পিডে ভরবেগ কম হয়। আর স্পিড বেশি হলে ভরবেগ বেশি হবে। ভরবেগ কম হলে ব্রিজ ভাঙ্গার ঝুঁকি কম। হ্যাঁ। বললেন নীলকান্তবাবু। নইলে দুর্বল ব্রিজে উঠে তাড়াতাড়ি পার হয়ে গেলেই তো পারে। কখন ভেঙ্গে পড়ে এই ভয়টা তাড়াতাড়ি দূর হলেই ভালো। আকাশ বললো— তাহলে এর একক হবে ভরের একক এবং বেগের এককের গুণফল। হ্যাঁ। বললেন নীলকান্তবাবু। সিজিএস পদ্ধতিতে ভরের একক গ্রাম,আর বেগের একক সেন্টিমিটার পার সেকেন্ড। কাজেই ভরবেগের একক গ্রাম-সেন্টিমিটার পার সেকেন্ড। আকাশ বললো— দাঁড়াও মামা, আমি এমকেএস সিস্টেমে ভরবেগের এককটা বলে ফেলি। ভরের একক হলো কিলোগ্রাম, আর বেগের একক মিটার পার সেকেন্ড। তাহলে ভরবেগের একক হলো কিলোগ্রাম-মিটার পার সেকেন্ড। ঠিক বলেছিস। বললেন মামা। আর এফপিএস পদ্ধতিতে ভরবেগের একক পাউন্ড-ফুট পার সেকেন্ড। কণিকা বললো— একবার বলো স্পিড, এখন বলো বেগ। দুটো কি এক ? আকাশ বললো— হ্যাঁ, স্পিড মানেই হলো বেগ। নীলকান্তবাবু বললেন— না, দুটো পুরোপুরি এক নয়। স্পিড হলো দ্রুতি, বেগ নয়। যদিও দুটোই এক সেকেন্ডে কতটুকু যাওয়া যায় তা বোঝায়। তাহলে পার্থক্যটা কী ? বললো আকাশ। পার্থক্য হলো, স্পিড বলতে হলে কোনদিকে যেতে হবে সেটি বলতে হয় না। কিন্তু বেগ বা ভেলোসিটি বলতে হলে কোনদিকে যাবে, সেটিও বলতে হয়। মানে দিক উল্লেখ করতে হয়। আর মানের হিসাবে স্পিড এবং বেগ দুটো একই। বিন্দু বললো— ইশ, আর ভাল্লাগে না। এখন গান শুনতে হবে। রেখাদি গান শোনাও। রেখা বললো বুঝেছি। রবীন্দ্রনাথ এরজন্যই লিখেছেন— খরবায়ু বয় বেগে চারিদিক ছায় মেঘে, ওগো নেয়ে নাওখানি বাইও। বিন্দু বললো— গাও না রেখাদি। গানটা গেয়েই শোনাও। রেখা গান ধরলো— হেই মারো মারো টান হেইও হেইও হেইও। ওগো নেয়ে নাওখানি বাইও। নীলকান্তবাবু বললেন— এই রে, আমার অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।