মোজাহেদুল ইসলাম ঢেউ
আগামী দিনগুলোতে স্মার্টফোন ঠিক কেমন চেহারা পাবে, সেটা বলা মুশকিল। তবে বর্তমান সময়ে বিভিন্ন স্মার্টফোন নির্মাতারা যে গবেষণাগুলো চালিয়ে যাচ্ছে, তা থেকে সামনের দিনগুলোতে স্মার্টফোনের আদল খানিকটা আঁচ করা যায়। নিকট ভবিষ্যতে স্মার্টফোনের কিছু প্রবণতা তুলে ধরা হলো এই অংশে।
বড় স্ক্রিনের স্মার্টফোন
গত কয়েক বছরে স্মার্টফোনের বাজার লক্ষ্য করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর তা হলো স্মার্টফোনের আকার ক্রমেই বাড়ছে। স্ক্রিন এবং ডিসপ্লে ফিচার নিয়ে এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। একটা সময় পর্যন্ত ৪ ইঞ্চি ডিসপ্লের ফোনকেই অনেক বড় মনে করা হতো। তবে সময় বদলে গেছে। এখন বাজারে হরহামেশাই ৪.৩ ইঞ্চি, ৪.৭ ইঞ্চি, ৫ ইঞ্চি, ৫.৫ ইঞ্চির স্মার্টফোনের দেখা মেলে। শুধু তাই নয়, স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির মিশেলে ৬ ইঞ্চি এবং এর চেয়ে বড় ডিসপ্লের স্মার্টফোনও রয়েছে বাজারে। এদের অবশ্য আলাদা করে ফ্যাবলেট বলা হয়ে থাকে। এইচটিসি ওয়ান, স্যামসাং গ্যালাসি এস ৫ এবং সনি এক্সপেরিয়া জেড ২-এর মতো ফোনগুলো এমন বড় বড় ডিসপ্লে নিয়ে হাজির হয়েছে বাজারে। নতুন আইফোনেও এমন বড় ধরনের ডিসপ্লে যুক্ত হয়েছে। তাই আগামী দিনে ডিসপ্লের আকারে স্মার্টফোন বাড়তেই থাকবে, সেটা সহজেই অনুমেয়।
সার্বক্ষণিক ব্যাটারির সচলতা
স্মার্টফোনের ব্যাটারি স্বল্পতা এখনকার স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের অন্যতম অভিযোগের জায়গা। বন্ধুদের বাড়িতে অথবা চলার পথে চার্জার খুঁজে পাওয়া কঠিন। আর যদি আপনি গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে কোথাও যেতে চান আর আপনার স্মার্টফোনের ব্যাটারিটি সেসময় ব্যাকআপ দিতে না পারে, তাহলে তো স্মার্টফোনের স্মার্টনেসেরই অবমাননা হয়। আবার জিপিএস, থ্রিজি ইন্টারনেট সংযোগ, ওয়াই-ফাই প্রভৃতির ব্যবহার বেশ ভালো পরিমাণ ব্যাটারির চার্জ খরচ করে। তাই ‘অলওয়েজ কানেক্টেড’ স্লোগানের স্মার্টফোনে ব্যাটারি ব্যাকআপ প্রযুক্তিবিশ্বের জন্য ভাবনার বিষয়।
কিছু কোম্পানি অবশ্য ব্যাটারি ব্যাকআপের এই সমস্যা দূর করতে কাজ শুরু করে দিয়েছে। এর মধ্যে স্যামসাং তাদের গ্যালক্সি এস ৫-এ যুক্ত করেছে আল্ট্রা পাওয়ার সেভিং মোড, যা স্মার্টফোনটিকে ২৪ ঘণ্টা মাত্র ১০% চার্জ খরচ করে চলতে সাহায্য করবে। পাওয়ার সেভিং মোড নিয়ে এমন আরও গবেষণাই চলছে। তবে পাওয়ার সেভিং মোডে সাধারণত বেসিক কিছু ফিচারই কাজ করে থাকে। তাই ব্যাটারির ব্যাকআপ বাড়ানো নিয়ে বিকল্প অনেক ভাবনাই ভাবছে বিভিন্ন স্তরের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিকল্প কিছু গবেষণার মধ্যে উল্লেখ করা যায় ওয়াইসিপসের কথা। এটি মূলত স্মার্টফোনের সাথে যুক্ত করা একটি সোলার প্যানেল। স্মার্টফোন ছাড়াও অন্যান্য বহনযোগ্য ডিভাইসে (যেমন—ট্যাবলেট পিসি, স্মার্ট হাতঘড়ি প্রভৃতি) এটি সৌরশক্তি ব্যবহার করে সদা সচল রাখবে ব্যাটারিকে। এ ছাড়াও বায়োগ্রেড অনেক ব্যাটারি তৈরি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকরা। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দুই/তিন বছরের মধ্যেই এমন ব্যাটারি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে যাতে আর ব্যটারি ব্যাকআপ নিয়ে বাড়তি চিন্তা করতে হবে না।
মডিউলার স্মার্টফোন প্রযুক্তি
মডিউলার স্মার্টফোন তৈরির পেছনের কারণটি হলো ই-ওয়েস্ট। ধরা যাক, আপনার ফোনটি আউটডেট হয়ে গেছে। এখন হালনাগাদ সুবিধার ফোন ব্যবহার করতে চাইলে একে বদলে নিয়ে নতুন ফোন কেনাই এখনকার সময়ের একমাত্র সমাধান। তবে একে রিপ্লেস না করেই যদি এর বিভিন্ন হার্ডওয়্যার আপনি আপডেট করার সুযোগ পান, তখন আর আউটডেটেড ফোনটিকে ফেলে দিতে বা বদলে নিতে হয় না। ফোনের এই হার্ডওয়্যার আপগ্রেডের প্রযুক্তিই হলো মডিউলার ফোনের মূল ধারণা। মডিউলার স্মার্টফোনে ব্যবহারকারী নিজের দরকারের হার্ডওয়্যারকেই সংযুক্ত করে নিজের ফোনটি তৈরি করে নেওয়ার সুবিধা পায়। কেউ যদি মনে করে তার ফোনে কেবল সাধারণ সুবিধাগুলো থাকবে, সে সেই অনুযায়ী হার্ডওয়্যার বেছে নিতে পারে। পরবর্তী সময়ে তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার বা বর্তমানের চাইতে উন্নত ক্যামেরার দরকার হলে সে ওই হার্ডওয়্যারগুলোকে সংযুক্ত করে নিতে পারে তার ফোনে। ফলে মডিউলার স্মার্টফোনে আপনার ফোনকে পুরোনো হতে দেবে না।
স্মার্টফোন নির্মাতাদের মধ্যে গুগলই প্রথম চেষ্টা করছে মডিউলার স্মার্টফোন তৈরি করার জন্য। ধারণা করা হচ্ছে মডিউলার স্মার্টফোনটির মধ্য দিয়ে মোবাইল শিল্পে একটা বড় পরিবর্তন আসবে।
হাইব্রিড স্মার্টফোন
প্রযুক্তির পরিবর্তন ও উদ্ভাবন হয় এর ব্যবহারকারীর প্রয়োজনেই। স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরাদের চাহিদা বাড়ছে সরলীকরণের দিকে। যেমন—স্মার্টফোনে এখন প্রায় সব ধরনের কম্পিউটিং কাজই করা যায়। ফলে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের অনেকেই এখন স্মার্টফোন থেকেই তাদের যাবতীয় প্রয়োজন মেটাতে কাজ করতে চান। আর তখন স্মার্টফোনের চেনা রূপটি তাদের খুব বেশি সহায়তা করে না। এক্ষেত্রে স্মার্টফোনের সাথে বাড়তি কিবোর্ড ব্যবহার করে একে ল্যাপটপের মতো করে ব্যবহারের সুবিধা পেলে কাজগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। এই ধরনের ধারণা নিয়েই এর মধ্যে আসুস বাজারে এনেছে ট্রান্সফর্মার বুক। এই ধরনের ডিভাইসকে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট পিসি কিংবা ল্যাপটপ—চাহিদা অনুযায়ী যেকোনো রূপে ব্যবহার করা যায়। শুধু তাই নয়, অনেকেই আবার এমন ধরনের হাইব্রিড ডিভাইসে ব্যবহার করছে ডুয়াল অপারেটিং সিস্টেম। স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট পিসি হিসেবে কাজ করার সময় এটি অ্যান্ড্রয়েডে কাজ করলেও ল্যাপটপ মোডে এটি দিব্যি উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমে কাজ করবে। এই ধরনের হাইব্রিড ডিভাইস তাই ভবিষ্যতের দিনের অন্যতম প্রবণতায় পরিণত হতে পারবে।
থ্রিডি প্রিন্ট হবে স্মার্টফোন
বর্তমান সময়ে থ্রিডি প্রিন্টিং একটি অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি। খুব দ্রুতই থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের ক্ষেত্র বাড়ছে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই থ্রিডি প্রিন্টিং সাধারণ ব্যবহারকারীদের হাতের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। তবে পিসির জন্য কার্যকরী এই থ্রিডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি কি আপনি আপনার স্মার্টফোনেও ব্যবহার করতে পারবেন? কিংবা এতসব জিনিস যখন থ্রিডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা যায়, তখন আপনার ফোনটিও কি থ্রিডি প্রিন্টারে তৈরি করে নিতে পারবেন?
এর সহজ উত্তর হলো, হ্যাঁ। এর মধ্যে নকিয়া তার প্রমাণ রেখেছে। নকিয়ার লুমিয়া ৮২০ মডেলের ফোনটি কিন্তু ব্যবহারকারী তার পছন্দের ডিজাইনে তৈরি করে নিতে পারেন থ্রিডি প্রিন্টারের সাহায্যে। শুনতে খানিকটা অসম্ভব মনে হলেও বিষয়টি সত্যি।