কালো টাকা উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হতে পারে

বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে সেটি হল কালো টাকার ব্যবহার। তবে এই কালো টাকা বিনিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। অবশ্য কঠিন শর্তে। বলেছে, উত্পাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে কালো টাকা। গতকাল শনিবার সমিতি আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, অবকাঠামো বিশেষত রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও বিদ্যুত্ কেন্দে এ অর্থ বিনিয়োগের কথা ভাবা যেতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও এই সমস্যা সমাধানে একটি কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছে অর্থনীতি সমিতি। বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাতে অর্থনীতি সমিতির ইস্কাটনস্থ কার্যালয়ে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। বাজেটে কালো টাকা আবাসন খাতে বিনিয়োগের বিদ্যমান সুযোগ অব্যাহত থাকায় প্রশ্নের মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবার বাজেট পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল করা হবে বলে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন তিনি। সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেন, দেশের অর্থনীতিতে পুঞ্জিভূত কালো টাকার পরিমাণ ৪২ থেকে ৮০ শতাংশ বা পাঁচ থেকে সাত লাখ কোটি টাকা। বিষয়টি সত্য। এ অর্থ উদ্ধার হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন যাতে সত্ ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে অসত্ হতে প্রণোদিত না হন। বাজেট নিয়ে সার্বিকভাবে শাস্তি প্রকাশ করলেও সময়মত ও গুণগত বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে অর্থনীতি সমিতি। এছাড়া বাজেট বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে বলে মনে করা হয়। আবুল বারকাত বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকবে এমন প্রত্যাশায় অর্থমন্ত্রী বাজেটের আকার নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু রোজার পর তার এই প্রত্যাশা ভাঙ্গা শুরু হতে পারে। আসছে অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে। যে সব অনুমানের উপর ভিত্তি করে জিডিপি প্রাক্কলন করা হয়েছে সেখানে কোথাও ছেদ পড়লে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয় বলে মনে করে অর্থনীতি সমিতি। এছাড়া জিডিপি’র ভিত্তিতে দুর্বলতা রয়েছে দাবি করে আবুল বারকাত বলেন, পুুঁজিবাজার সংস্কারে সুনির্দিষ্ট বিষয় নেই। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ কিভাবে আসবে তাও স্পষ্ট নয়। কারণ দেশি বিনিয়োগকারীরা যেখানে সাহস পান না সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কিভাবে আসবে? রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরে দ্রব্যমূল্য সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দুই লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। এই ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া আসছে বাজেটে সরকারের ৩১ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গেও দ্বিমত পোষণ করা হয়। অর্থনীতি সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের ব্যাংক ঋণ তারল্যের উপর চাপ বাড়াবে। যা সুদের হার বাড়াবে। এর ফলে শিল্প খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। যা প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সার্বিক বিবেচনায় অর্থনীতি সমিতি চূড়ান্ত বাজেট অন্তর্ভুক্তির জন্য ২৫টি সুপারিশ দিয়েছে। সময়মত ও গুণগত বাজেট বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাসমূহের সক্ষমতা, সমন্বয় ও পরিবীক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর উপর জোর দেয়া হয়েছে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে পেশাজীবী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ফি ব্যাংকে পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা, অ্যাকাউন্টিং ফার্মের ৭৫ শতাংশ আয়ের উপর কর্পোরেট করহার প্রয়োগ করা, প্রতি তিন বছর পর পর সম্পত্তির মূল্যায়ন করা এবং এর ভিত্তিতে কর আদায়, ইউনিয়ন পর্যায়ে করদাতা শুমারি, সকল মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিবৃতি প্রস্তুত বাধ্যতামূলক করা, কর্মকর্তাদের বৈষম্যমূলক ক্ষমতা কমিয়ে দেয়া, অনুন্নয়নমূলক খরচ কমানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ভূমি প্রাপ্তি সহজ করা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি হ্রাস, বিদ্যুত্-জ্বালানির সহজলভ্যতাসহ নীতি সহায়তা দানের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ২০১০ সালের পুঁজিবাজার ধসের সাথে জড়িতদের শাস্তি প্রদান এবং কারসাজি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে দেশে এক কোটি টাকার উপরে কর দেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০ জন। অর্থনীতি সমিতি মনে করে, দেশের এমন ব্যক্তির সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার। তাদেরকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কর আদায় করা গেলে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি আয়কর আদায় সম্ভব। চূড়ান্ত বাজেটে এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়ার সুপারিশ করা হয়।