অভিশাপ নয়, প্রতিটি নাগরিক হোক সম্পদ

যেকোনো রাষ্ট্রের প্রাথমিক উপাদান ও পূর্বশর্ত হচ্ছে জনসমষ্টি। জনসমষ্টি ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনসমষ্টি একান্ত অপরিহার্য। সাধারণত রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কেননা রাষ্ট্রের নাগরিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যজ্ঞানের ওপর রাষ্ট্রের কার্যক্রমের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করে। নাগরিকের দেশপ্রেম, দেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় দেশকে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়।

আবার অন্যদিকে আমাদের মতো আয়তনে ছোট্ট রাষ্ট্রের জন্য অতিরিক্ত জনসংখ্যা প্রধান ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত লাগামহীনভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেন দেশের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে সরকারের সুপরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে বেকারত্বের হার দিন দিন বাড়ছে। এই কারণে তরুণদের মাঝে হতাশার মেঘ স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। যেটা রাষ্ট্রের জন্য বড়ই উদ্বেগের বিষয়। এর পাশাপাশি শিশু মৃত্যুহার বৃদ্ধি, খাদ্যের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ, উপযুক্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে না পারাটা রাষ্ট্রের জন্য বড়ই চিন্তার বিষয়। যে কারণে অনেকে এই বর্ধিত জনসংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে অভিশাপ হিসাবে চিহ্নিত করছে।

 দেশের মোট আয়তনের তুলনায় অতিরিক্ত জনসংখ্যা হওয়ায় ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রতি এক কিলোমিটারে হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করে। সঙ্গে এই বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজনে নতুন আবাসস্থল তৈরির জন্য ফসলের জমিকে ব্যবহার করাই চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। তরুণ ও যুবক সমাজ শিক্ষা নিলেও, সীমিত কর্মসংস্থানের বিপরীতে বিরাট সংখ্যক চাকরি প্রার্থী হওয়ায় অধিকাংশ তরুণ  নিয়োগে ব্যর্থ হয়ে বেকারত্বের হার বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে কয়েকটি নিয়োগ পরীক্ষার দিকে দৃষ্টি দিলেই তা অনুধাবন করা যায়। বিসিএস, প্রাইমারি নিয়োগ পরীক্ষা, কিংবা নিবন্ধন পরীক্ষা যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চার লাখ চাকরি প্রার্থী হতে চাকরি পাবেন মাত্র দু’হাজার অথবা চব্বিশ লাখ হতে মাত্র কুড়ি হাজার। এ যেন সোনার হরিণ শিকার! শিকারে ব্যর্থ হওয়ার  ফলশ্রুতিতে এইসব শিক্ষিত তরুণ দেশের সম্পদের বিপরীতে অভিশাপে পরিণত হচ্ছে। হতাশায় নিমজ্জিত মানুষের সংখ্যা বেড়ে চলা যেন স্বাভাবিক ব্যাপার।

একজন নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের প্রতি যে-সকল দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকে, তা যথাযথ পালন করলে হতে পারে বড় পরিবর্তন। রাষ্ট্র যেমন নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দিয়ে থাকে তেমনি রাষ্ট্রের প্রতিও নাগরিকদের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা, আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা প্রত্যেকের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের উপর নির্ভর না করে নিজস্ব উদ্যোগে নানামুখী কর্মের সৃষ্টি করা সুনাগরিকের কর্তব্য। এবং প্রত্যেকে কিভাবে একজন সফল নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের সম্পদে পরিণত হওয়া যায় সে সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায় হতে কিভাবে রাষ্ট্রকে এগিয়ে চলতে অবদান রাখা যায় সে বিষয়েও অবহিত হতে হবে।

একজন নাগরিককে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত করতে সামাজিক কিছু দায়িত্ব আছে আমাদের প্রত্যেকেরই। জীবনমুখী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রেরণা জোগানো। যেখানে নিজের পাশাপাশি অন্যের কর্মসংস্থান সৃষ্টিও যেন সম্ভব হয়। চাপ প্রয়োগ না করে বাস্তব জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার করার মাধ্যমে নাগরিককে তার সৃজনশীল ক্ষমতা প্রকাশে সর্বাত্মক সাহায্য করতে হবে। এসকল সামাজিক কাজ করার মাধ্যমে সুনাগরিক গড়া সম্ভব।

নাগরিকদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারে উদ্বুদ্ধকরণ। সঙ্গে সঙ্গে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। যার ফলে তারা তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আউটসোর্সিং ও বিভিন্ন খাতে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রেরণা পায়। এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে দেশের উন্নয়নে গর্বের অংশীদার হতে পারে।

পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও ভাবতে হবে। দেশে নাগরিকের অর্ধেকাংশ যেহেতু নারী সেহেতু তাদের নিয়ে পরিকল্পনা করাও আবশ্যক। নারীদেরকে অবহেলার  চোখে দেখলে জাতীয় অগ্রগতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যেন জাতীয় অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারে সে সুযোগ সৃষ্টি করা উচিত। এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ও সরকারের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সুন্দর হবে আমাদের ভবিষ্যত্। সঙ্গে সঙ্গে শান্তিময় পরিবেশ দান করতে সক্ষম হবো আমাদের নতুন প্রজন্মকে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ