ইউক্রেন : শান্তি নয়, যুদ্ধ চাই!

পূর্ব ইউক্রেন-এখন এক অগ্নিগর্ভের নাম। ইউক্রেনের সেনাবাহিনী আর মস্কোপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে সেখানে চলছে রক্তক্ষয়ী লড়াই। একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া, অন্যদিকে তাদের বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। এরই মধ্যে দোনেস্ক ও লুহানস্ক এলাকায় দু’পক্ষের সংঘর্ষে মারা গেছে দু’পক্ষের বহু সদস্য। শুক্রবারও ইউক্রেনের একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। এর আগেও একাধিক সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত করে তারা। রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সাফ ঘোষণা দিয়েছে, ইউক্রেন সরকারের সঙ্গে শান্তি তাদের কাম্য নয়। ক্রিমিয়ার মতো রাশিয়ার সঙ্গে একীভূত হবার জন্য তারা যুদ্ধ চায়! এ অবস্থায় ইউক্রেনের সামনে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নিজের সদ্য নির্বাচিত সরকার। কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কিয়েভের আর কোনো বাধা নেই। নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নিয়েই ঘোষণা দেন, ‘ক্রিমিয়া ইউক্রেনের ছিলো, আছে এবং থাকবে’। বিশ্ববাসীর চোখ তাই এখন ইউক্রেনের পরিবর্তিত পরিস্থিতির দিকে। সবাই জানে, রাশিয়া আর যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো দ্বন্দ্বের নতুন ঘুঁটি ইউক্রেন। শনিবার শপথ নেন ইউক্রেনের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেনকো। কিয়েভের পার্লামেন্ট ভবনে তার অভিষেক হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অসংখ্য বিদেশি কূটনীতিক। এ সময় দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট পোরোশেনকো শান্তি, নিরাপত্তা আর জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। ৪৮ বছর বয়সী এই নেতা বলেন, ‘ইউক্রেনের জনগণের বহু ত্যাগ সত্ত্বেও যুদ্ধ বা প্রতিশোধ, কোনোটাই আমি চাই না’। আঞ্চলিক একতার প্রশ্নে কোনো আলোচনা নয় বলেও তিনি সাফ জানিয়ে দেন। একই সাথে পূর্ব ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানিয়ে প্রেসিডেন্ট পোরোশেনকো তাদের সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। পূর্ব ইউক্রেনের চলতি পরিস্থিতির জন্য তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে দায়ী করেন। পোরোশেনকো অভিযোগ করেন, ইয়ানুকোভিচ পূর্ব ইউক্রেনে সন্ত্রাসীদের অর্থায়ন করেছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে এক গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় ইয়ানুকোভিচের। কিয়েভ থেকে তিনি পালাতে বাধ্য হন। এরপর, গত ২৫ মে’র নির্বাচনে বিজয়ী হলে রোশেন চকলেট গ্রুপের মালিক পোরোশেনকোকে সমর্থনের জোয়ারে ভাসিয়ে দেন পশ্চিমা নেতারা। পোরোশেনকোর শপথ যখন চলছিল, পূর্ব ইউক্রেনের দোনেস্ক অঞ্চলের স্লোভিয়ানস্ক এবং মারিউপলে তখন শোনা যাচ্ছিল ব্যাপক গুলিবর্ষণের শব্দ। সাথে মর্টার শেল। আঞ্চলিক প্রশাসনিক ভবনগুলো দখলে নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বীরদর্পে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর সাথে। সেখানে তারা নিজেদের স্বাধীন দোনেস্ক গণপ্রজাতন্ত্রের লোক বলে ঘোষণা দিয়েছে। পেত্রো পোরোশেনকোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবেও মানতে নারাজ বন্দুকধারীরা। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য হলো, দোনেস্ক ইউক্রেনেরই অংশ। স্বাধীন হবার মতো আর্থিক সক্ষমতা দোনেস্কের নেই। তাই তারা চান, শান্তি আর স্থিতি। যা ঘটছে, তাতে তারা খুবই মর্মাহত। কিন্তু মস্কোপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সাফ কথা, প্রেসিডেন্ট পোরোশেনকো আর ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে শান্তি বা সমঝোতার বৈঠক হলেও তারা ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন। এ দিক থেকে তাই অস্ত্রবিরতির আশা নেই বলেই মনে হয়। রাশিয়া শুরু থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন যোগানোর অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পেছনে রাশিয়ার মতোই বড় শক্তির সমর্থন রয়েছে। ইউক্রেনের সামরিক বিমান ভূপাতিত করতে যে সব ভারী অস্ত্র তারা ব্যবহার করেছে, তা রাশিয়ার তৈরি। তাই রাশিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা প্রায় শতভাগ রুশ ভাষাভাষীদের ঐ অঞ্চলে মস্কোর ভাল সমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আল্টিমেটাম ফুরিয়ে গেলে হয়তো রাশিয়া পাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এভাবে কতদূর যেতে পারবে দেশটি, তা সবার কাছে একটা বিরাট প্রশ্ন। সাধারণ কূটনৈতিক শিষ্টাচারিতার অংশ হিসেবে প্রতিবেশী দেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচনে রাশিয়ার স্বীকৃতি হয়তো উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে কিছুটা শান্ত করবে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।