বরিশালে ছয় বছরে ১২ জন নিখোঁজ

গত ছয় বছরে বরিশালে এক ডজনেরও বেশি ব্যক্তি নিখোঁজ হলেও তাদের সন্ধান মেলেনি আজো। এসব ব্যক্তির অধিকাংশকেই আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়েছে। পরে তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে বলে আশঙ্কা নিখোঁজদের পরিবারের। নিখোঁজদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা ছাড়াও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রয়েছেন। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের অপহরণ কিংবা হত্যা করে লাশ গুমের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করা হচ্ছে। এখানে নিখোঁজ আতঙ্ক শুরু হয় মূলত ২০০৭ সালে। ঐ বছরের ১ ডিসেম্বর নগরীর কাউনিয়ার বাসা থেকে অপহরণ করা হয় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক শফিকুল্লাহ মোনায়েমকে। র্যাব পরিচয়ে তাকে বাসা থেকে তুলে নেয়া হলেও তার হদিস মেলেনি আজো। ২০১০ সালে জেলায় সর্বোচ্চ ৫ জনকে অপহরণ করার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উজিরপুর উপজেলার হারতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা হুমায়ুন কবীর খানকে ঐ বছরের ২৩ নভেম্বর আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে ঢাকার রামপুরা এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়। তবে তাকে অপহরণ কিংবা আটকের খবর স্বীকার করেনি কোন সরকারি সংস্থা। আন্দোলন-সংগ্রাম ও পরিবারের চোখের পানি নিখোঁজ হুমায়ুনের কোন সন্ধান দিতে পারেনি। এ ঘটনায় হুমায়ুনের স্ত্রী রত্না বেগম রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন। রত্না বেগম জানান, নিখোঁজ স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করেও কোন সুফল মেলেনি। একই বছরের ২৫ ডিসেম্বর নগরীর করিম কুটির এলাকার আব্দুর রশিদের পুত্র ২১ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবুল হায়দারকে রাজধানীর মহাখালী এলাকার একটি হোটেলের নীচতলা থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আইন-শৃংখলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে র্যাবের প্রধান কার্যালয়ে অভিযোগ দিয়েও কোন লাভ হয়নি বলে জানান তার স্ত্রী রোমানা। ২০১০ সালের ১৯ মার্চ পাথরঘাটার চরদোয়ানি বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তালুকেরচর গ্রামের মত্স্য ব্যবসায়ী আবুল কালাম। নিখোঁজের পর পরই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আবুল কালামের পরিবার অভিযোগ করেন, আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। এছাড়া ঝালকাঠির রাজাপুরের সাঁতুরিয়া এলাকার ফোরকান, মিজান ও তার ভাই মোর্শেদ স্থানীয় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসাবে পরিচিত ছিল। তাদের ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে একই দিন উত্তরাসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় বলে খবর বের হয়। অপহরণের কিছুদিন পর তুরাগ নদী সংলগ্ন বালুর মাঠ থেকে একাধিক লাশ উদ্ধার করা হয়। এরমধ্যে মিজান ও ফোরকানের লাশ সনাক্ত করে তাদের কবর দেয়া হয়। কিন্তু মোর্শেদ কিছুদিন পর এলাকায় ফিরে আসলে মিজান ও ফোরকানের কবর থেকে লাশ তুলে পুলিশ ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হয় লাশ দু’টি তাদের নয়। মিজান ও ফোরকানের কবরে কাদের লাশ মাটি দেয়া হয়েছে তা আজো রহস্যই রয়ে গেছে। ২০১১ সালের ২৪ মার্চ সরকারি বরিশাল কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাফসান আহমেদ জিতু খুনের ঘটনার মূল হোতা মহানগরীর ২০নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খান কালু ও তার ভাই মিরাজকে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অপহরণের পর গুপ্ত হত্যা করেছে বলে সাংবাদিক সম্মেলনে তাদের মা ফিরোজা বেগম অভিযোগ করেন। গত দু’বছরেও কালু ও মিরাজের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১২ সালের আগস্ট মাসে গৌরনদীর টরকী এলাকা থেকে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়া হয় পাশের কালকিনি উপজেলার সর্বহারা নেতা হুমায়ুন কবির টিপুকে। আজও তার হদিস মেলেনি। সর্বশেষ গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ গিয়ে নিখোঁজ হন বরিশাল জেলা টেম্পু ও আলফা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শ্রমিক লীগ নেতা কামাল সরদার ওরফে ফাঁসি কামাল। তার ভাই মনির সরদার জানান, নিখোঁজ হওয়ার ৩ দিন পর মিরপুর এলাকায় তার ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি খোলা পাওয়া গেলেও আজ পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার কোন হদিস করতে পারেনি। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর উজিরপুর থেকে ডাক্তার দেখাতে এসে নগরী থেকে নিখোঁজ হন শাহাদাত হোসেন (২৬)। তার পিতা উজিরপুর উপজেলার মালিকান্দা গ্রামের নুরুল ইসলাম বেপারী জানান, তাকে অপহরণ করা হতে পারে বলে তার আশঙ্কা। একইভাবে গত বছরের মে মাসে পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন সাগরের মত্স্য শিকারী শাহে আলম। তার সন্ধান আজ পর্যন্ত মেলেনি। একই বছরের জুন মাস থেকে নিখোঁজ রয়েছেন একই উপজেলার পদ্মাস্লুইচ গ্রামের জেলে কবির হোসেন। কবিরের বাবা আব্দুল হালিম জানান, সাদা পোশাকে একদল ব্যক্তি আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। কবিরের ভাগ্যে কি জুটেছে তা পরিবারের লোকজন আজো জানেন না।