বিশ্বকাপের মাঠ

অ্যারেনা ডি আমাজনিয়া ‘আমাজনের হূদয়’ নামের মানাস শহরে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি। এখানকার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেও ভাল নয়। তাই এই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচগুলো দেখতে আকাশপথ বা বিমানপথে দল ও সমর্থকদের যেতে হবে। বিশ্বকাপ চলাকালে মানাস অঞ্চলে থাকবে প্রচণ্ড তাপমাত্রা। এই তাপমাত্রায় খেলোয়াড়দের টিকে থাকা অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এখানকার তাপমাত্রা নিয়ে এরই মধ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের কোচ রয় হডসন। আমাজনিয়ায় বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অ্যারেনা ডি বাইক্সাদা কুরিতিবা শহরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি তৈরি হয়েছিল ১৯১৪ সালে। ১০০ বছরের পুরনো এই স্টেডিয়ামে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পুরো ভেঙে ১৯৯৯ সালে স্টেডিয়ামটি নতুন করে তৈরি করা হয়। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভেন্যুটিকে আরও আধুনিক করা হয়েছে। সংস্কার কাজের সময় ব্রাজিল কর্তৃপক্ষকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এখানে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। অ্যারেনা প্যান্টানাল ‘আমাজন অঞ্চলের দক্ষিণ গেইট’ বলে পরিচিত কুয়েবা শহরে অবস্থিত স্টেডিয়ামটি। এই শহরটি খাবার, নাচ, গান এবং হস্তশিল্পের জন্য বিখ্যাত। সবুজে ঘেরা প্যান্টানাল স্টেডিয়ামটি সম্পূর্ণ নতুন। স্টেডিয়ামটি নিয়ে ব্রাজিলকে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছে। ফিফার কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের সময় এই স্টেডিয়ামের বাইরেই সাধারণ মানুষ বিক্ষোভও করেছিল। এখানে শুধু গ্রুপ পর্বের ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে। অ্যারেনা দ্যস দুনাস প্রখ্যাত ক্রীড়া স্থাপতি ক্রিস্টোফার লির হাতে গড়া এই স্টেডিয়াম। তার মতে এটি ব্রাজিলের সবচেয়ে যথাযথ স্টেডিয়াম। এটাতে রাখা হয়েছে একটি কৃত্রিম লেক, একটি শপিং মল এবং আন্তর্জাতিকমানের হোটেল। স্টেডিয়ামটি ঘেঁষে চলেছে বিআর-১০১ নামের হাইওয়ে, যা ব্রাজিলের ১২ প্রদেশকে যুক্ত করেছে। ২০১১ সালে ভেঙ্গে ফেলা পুরোনো মাচাদাও স্টেডিয়ামের জায়গায় গড়ে ওঠা ডাস ডুনাসে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। দাস দুনাসের শহরটিতে বছরের বেশিরভাগ সময় উচ্চ তাপমাত্রা থাকে। অনেকে এটাকে ‘সূর্যের শহর’ বলে থাকে। অ্যারেনা ফন্তে নোভা ‘ব্রাজিল’স ক্যাপিটাল অব হ্যাপিনেস’ অর্থাত্ ব্রাজিলের সুখের রাজধানীতে অবস্থিত অ্যারেনা ফন্তে নোভা। এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এবারের বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচ। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে প্রথম বিশ্বকাপের ১ বছর পর তৈরি হওয়া স্টেডিয়ামটির নাম আগে ছিল স্ট্যাডিও অক্তাভিও মাঙ্গাবেইরা। ২০০৭ সালে এই স্টেডিয়াম বন্ধ করে দিয়ে নতুন করে নির্মাণ করা হয়। নবনির্মিত স্টেডিয়ামটির নাম দেয়া হয় ফন্তে নোভা। নবনির্মিত স্টেডিয়ামটিতে বিশ্বকাপ উপলক্ষেও সংস্কার আনা হয়েছে। সংস্কারের পর ফন্তে নোভায় একটি ফুটবল জাদুঘরও রাখা হয়েছে। তবে কমে গেছে আসন সংখ্যা। স্টেডিয়ামটি দেখতে অশ্বক্ষুরাকৃতির মতো। ন্যাসিওনাল স্টেডিয়াম ব্রাজিলের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করা হয় ১৯৭৪ সালে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা ড্রিবলার হিসেবে পরিচিত গ্যারিঞ্চার নামে স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয় স্তাদিও ন্যাশিওনাল মানে গারিঞ্চা। স্টেডিয়ামটি নির্মাণের সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক ৪০। ২০১৪ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে স্তাদিও ন্যাশিওনাল সংস্কার করা হয়েছে। মাঠের সামনের অংশটা একেবারেই নতুন করে তৈরি করা হয়। ধাতব ছাদ ও স্ট্যান্ড বানানো হয়েছে। এই মাঠের সব আসন থেকে মাঠের সব অংশ দেখা যাবে। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণকারী ম্যাচ এখানে অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৩ সালে কনফেডারেশন কাপের উদ্বোধনী ম্যাচ এই স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিশ্বকাপের পর এখানে কনসার্ট ও কালচারাল ইভেন্টের অনুষ্ঠান হবে। অ্যারেনা পারনামবুকু রেসিফ শহরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি একেবারেই নতুন। এর কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে। গতবছরের মে মাসে শেষ হয় স্টেডিয়ামটির কাজ। এখানে গ্রুপ পর্ব ও রাউন্ড-১৬ এর ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। বিশ্বকাপের পর এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হিসেবে ব্যবহূত হবে। এছাড়া এখানে সৌর বিদ্যুত্ প্লান্ট নির্মাণের কাজও চলছে; যা গড়ে ৬ হাজার মানুষের বিদ্যুত্ সরবরাহ করতে পারবে। পারনামবুকুয় রেস্তোরাঁ, শপিং সেন্টার ও সিনেমা দেখার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শুরু হবে সাও পাওলোয়; শেষ হবে মারাকানায়। রচিত হবে নতুন ইতিহাস, বিশ্ব দেখবে চ্যাম্পিয়নদের। নানা অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চস্থ করতে তৈরি ২০১৪ বিশ্বকাপের স্বাগতিক ব্রাজিলের ১২টি ভেন্যু। এখন কেবল সবুজ ঘাসে মেসি, রোনালদো, নেইমারদের পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার পালা। দলগুলো সফল হোক বা ব্যর্থ হোক সংশ্লিষ্ট স্টেডিয়ামের নাম পাশে লেখা থাকবেই। অতীতের মতো এবারও বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোতে নজর থাকবে সবার। সব ভেন্যুই মারাকানার মতো সুবিশাল নয় বা অ্যারেনা বাইক্সাদার মতো ছোটও নয়। স্থানিক দূরত্বের কারণে আবহাওয়াগত পার্থক্যের পাশাপাশি অবকাঠামোগত দিক থেকেও ভেন্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈচিত্র্যতা। আবার সবগুলোই ভেন্যুই সব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কোনো কোনো ভেন্যুতে গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শেষেই পর্দা নামবে। আবার কোনোটি আয়োজন করবে নক-আউট পর্বের ম্যাচ। শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত লড়াইটা তো অনুষ্ঠিত হবে মারাকানায়ই। ব্রাজিল বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোর সাতকাহন নিয়ে এই আয়োজন। লিখেছেন দেলোয়ার মাসুম— বেইরা রিও স্টেডিয়াম পর্তো অ্যালেগ্রিতে এই স্টেডিয়ামটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১০ বছর। নির্মাণ কাজ শেষে ১৯৬৯ সালে সর্বপ্রথম খুলে দেয়া হয়। ফুটবল-প্রেমীরা ইট, সিমেন্ট ও লোহা দিয়ে এটি তৈরিতে অবদান রাখেন। বিশ্বকাপের জন্য ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। গতবছরের শেষের দিকে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও আর্থিক সমস্যার কারণে কাজ শেষ করতে দেরি হয়। ৪৮ হাজার ৮৪৯ জন দর্শক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন স্টেডিয়ামটিতে গ্রুপ পর্ব ও রাউন্ড-১৬’র ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ক্যাস্তেলাও স্টেডিয়াম এই স্টেডিয়ামে এবারের বিশ্বকাপের ছয়টি ম্যাচ হবে, যার মধ্যে দ্বিতীয় পর্বের একটি ও কোয়ার্টার ফাইনালের একটি ম্যাচও আছে। ফর্তেলেজা শহরে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামটি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে পুনঃসংস্কার করা স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে এটির কাজই সর্বপ্রথম শেষ হয়। সংস্কার করে বৃহত্ ছাদ তৈরিসহ আন্ডারগ্রাউন্ডে ৪২০০ গাড়ি পার্কিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্টেডিয়ামটির নাম রাখা হয় সিয়েরার সাবেক গভর্নর প্লাসিদো আদেরালদো ক্যাস্তেলাওয়ের নামে। ২০০০ সালে এই স্টেডিয়ামের পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ১০ বছর মেয়াদী নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর স্টেডিয়ামের নাম বদল করে রাখা হয় শুধু ক্যাস্তেলাও। মিনেইরো স্টেডিয়াম নয়নাভিরাম স্টেডিয়াম এটি। ৬২,৫৪৭ ধারণক্ষমতার স্তাদিও মিনেইরোতে এবারের বিশ্বকাপের একটি সেমিফাইনালসহ ৬টি ম্যাচ হবে। ১৯৬৫ সালে তৈরি করা স্টেডিয়ামটিকে জাতীয় নিদর্শন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের ম্যাচ এবং গতবছর ফিফা কনফেডারেশন কাপের ম্যাচও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভেন্যুটিতে হালকা সংস্কার করা হয়েছে। সামনের অংশ ও ছাদ সংরক্ষণ করেই সংস্কার কাজ করতে হয়েছে। তবে মাঠটিকে ৩.৪ মিটার নিচু করা হয়েছে। কারণ রানিং ট্র্যাক সরিয়ে মাঠের ঠিক কাছাকাছিতে বসার আসন বানানো হয়েছে। মারাকানা স্টেডিয়াম সাংবাদিকের নামটি ছিল মারিও ফিলহো। ছিলেন রিও ডি জেনেরিওর বাসিন্দা। এই স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য মারিও প্রথম প্রস্তাব করেন। এ নিয়ে তিনি অনেক লেখালেখিও করেন। তৈরির পর স্টেডিয়ামটির নামকরণ হয়েছিল তারই নামে ‘স্তাদিও জার্নালিস্তা মারিও ফিলিও’। পরবর্তীতে রিও ডি জেনেরিওর একটি নদীর নামও রিও মারাকানার নামেই পরিচিতি পেয়ে যায়। মারকানা মানেই ১৯৫০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কালো ছায়া। এ ভেন্যুতেই ওই বিশ্বকাপের ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে হেরেছিল স্বাগতিক ব্রাজিল। এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচও অনুষ্ঠিত হবে এই মারাকানাতেই। ১৯৫০ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ২ লাখেরও বেশি মানুষ খেলা দেখেছিল। বেশ কয়েকবার সংস্কারের পর এখন দর্শক ধারণক্ষমতা কমে ৭৬ হাজার ৮০৪। তবে এটি এখনও ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম। অ্যারেনা ডি সাও পাওলো সাও পাওলোতেই ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়ার ম্যাচের মধ্যদিয়েই শুরু হবে এবারের বিশ্বকাপের লড়াই। ব্রাজিল ফুটবলের পিতা বলে পরিচিত চার্লস মিলারের জন্ম এই সাও পাওলোতেই। তার হাত ধরেই এই শহরে ফুটবল খেলার প্রচলন শুরু হয়। ব্রাজিল ফুটবলের বর্তমান সেরা তারকা নেইমারের জন্মও এই শহরেই। এই শহরকে ব্রাজিলের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ বলা হয়ে থাকে। আয়তনের দিক থেকে সাও পাওলো ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর সপ্তম বড় শহর। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্টক এক্সচেঞ্জ মার্কেট এই শহরেই। বছরের বেশিরভাগ সময়েই সাও পাওলোতে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হওয়ায় অনেকে শহরটিকে ‘ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির শহর’ বলে থাকে। ব্রাজিলের ক্লাব ফুটবলের তিনটি শক্ত দলই এই শহরের (করিন্থিয়ান্স, পালমেইরাস এবং সাও পাওলো)। এবারের বিশ্বকাপে অ্যারেনা ডি সাও পাওলোয় গ্রুপ পর্বের ম্যাচ ছাড়াও রাউন্ড ১৬ ও সেমিফাইনালের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।