হতশ্রী বরিশাল নগরী
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৪, ২৩:০৭
মাত্র এক বছরেই সৌন্দর্য হারাতে বসেছে প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশাল নগরী। আধুনিকতার ছোঁয়ায় ঝকমকে দৃষ্টি নন্দন স্থাপনাগুলো দিনে দিনে নোংরা বস্তিতে রূপ নিচ্ছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সড়ক ও মানুষের বসার বেঞ্চের নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই। তা দখল করে চলছে ঝুপড়ি ঘর তৈরির প্রতিযোগিতা।
সড়ক সংকুচিত হয়ে আসছে, দখলবাজ ভূমি-পিপাসুদের কারণে। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে বিবির পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে মাছ মরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অথচ এই বিবির পুকুরের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য সাবেক দুই মেয়রের আমলে কয়েক কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিগত মেয়র প্রয়াত শওকত হোসেন হিরনের আমলে বিবির পুকুর উন্নয়ন করা হয়েছিল। পুকুরের আশে-পাশের অবৈধ স্টল ও মার্কেট ভেঙ্গে তত্কালীন মেয়র ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেন। পুকুরের মাঝে ফোয়ারা ও দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা নগরবাসীর মনজয় করতো। সন্ধ্যায় মায়াবী এই আলোর পাশেই নির্মাণ করা হয় পাবলিক স্কোয়ার। পড়ন্ত বিকালে পুকুরের পাশে অসংখ্য তরুণ-তরুণী ভিড় করেন। পাবলিক স্কোয়ারে গভীর রাত পর্যন্ত চলতো আড্ডা। সেই ফোয়ারার আলো ঝলমলে পরিবেশ তো দূরের কথা, পুকুরের পানি নষ্ট হয়ে মাছ মরে দুর্গন্ধে পুকুরের নিকট দাঁড়ানো যায় না। পুকুরের তীর ঘেঁষে সদর রোড, গীর্জামহল্লা ও সোহেল চত্বরসহ চারপাশের সড়ক দিয়ে পথচারীরা চলাচল করেন নাকে রুমাল দিয়ে।
নগরীর প্রাণকেন্দ্রের যখন এ অবস্থা তখন আশেপাশের সৌন্দর্যমন্ডিত এলাকাগুলোর অবস্থা আরো করুণ। আরো একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছিল কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী শহররক্ষা বাঁধ। লঞ্চঘাট থেকে শুরু করে চরকাউয়া খেয়াঘাট, ফেরিঘাট ও মুক্তিযোদ্ধা পার্ক হয়ে চাঁদমারী পর্যন্ত দীর্ঘ কয়েক কিলোমিটার এ বাঁধের উপর হাঁটার সুবিধার্থে টাইল্স লাগানো হয়েছিল। সড়কের একপাশে নদী অপর পাশে বেঞ্চে ও ছাতা তৈরি করে দেয়া হয়েছিল। সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সেখানে সার্বক্ষণিক সিটি কর্পোরশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা কাজ করতো। বিকাল হলেই ভ্রমণ পিপাসু মানুষ কীর্তনখোলা নদীর পানিতে কুলুকুলু ধ্বনি শুনে প্রাণ জুড়াতো। নৌকা ভাড়া করে ভেসে বেড়াতো কীর্তনখোলার জলরাশিতে। এক বছর আগেও নদীর পাশে এত সুন্দর মনোরম পরিবেশ ছিল তা কিভাবে রাতারাতি বদলে গেল তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। চরকাউয়া ফেরিঘাট থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে এ সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানো হয়েছিল। সেই সৌন্দর্যমন্ডিত স্থান দখলের পর এখন মূল সড়কই দখল করে শত শত ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে পান, বিড়ি সিগারেট ও চায়ের দোকান বসানো হয়েছে। রাতের অন্ধকারে এসব দোকানে বিক্রি হয় গাঁজাসহ মাদকদ্রব্য। দখলের পর মাদকের স্পষ্ট গড়ে তোলা এ শহররক্ষা বাঁধের নোংরা পরিবেশ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। প্রস্তুত সড়ক ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপভোগের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল তা বিনষ্ট হয়েছে।
বর্তমান সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল নগরীর দখল হয়ে যাওয়া খাল উদ্ধারসহ জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হলেও আজ পর্যন্ত খাল উদ্ধারের কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেননি। বর্ষার শুরুতেই সামান্য বৃষ্টিতে এক হাঁটু পানি জমে যায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে। নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ধিত এলাকার অবস্থা আরো করুণ। কয়েকটি প্রবহমান খাল ভরাট করে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি ছোট খালগুলো ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই সর্বত্র পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে জনদুর্ভোগ। অতি বর্ষণ কিংবা ভারি বৃষ্টিতে ডুবে যায় নগরীর বেশিরভাগ সড়ক-অলিগলি। কোথাও আবার ড্রেন না থাকায় পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না। সড়ক ডুবে থাকায় স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। নারী-শিশু বৃদ্ধরা পড়েন ভোগান্তিতে। সাধারণ মানুষ এ দুর্ভোগের জন্য সিটি কর্পোরেশনের নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি দুষছেন অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে। তাদের অভিযোগ সড়কের চেয়ে ড্রেন উঁচু হওয়ায় অধিকাংশ এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতে হাঁটুপানি জমে যায়। পানি নিষ্কাশনের জন্য এ সব ড্রেন কোন কাজে লাগে না।
৫৮ বর্গকিলোমিটার এই নগরীর পুরানো ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকার অবস্থা মোটামুটি ভাল হলেও বাকী বর্ধিত এলাকার মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত। তারা বলেন, নামেই সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে এখন ট্যাক্সের বোঝা মাথায় চেপেছে। অথচ রাস্তাঘাট এখনো কাঁচা। কোথাও কোথাও বিদ্যুত্ পর্যন্ত নেই। নগরীতে আসতে হয় বাশের সাঁকো পার হয়ে।
নাগরিক জীবনে এমন দুর্ভোগের বিষয়ে সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান- এক বছর পূর্বে সিটি নির্বাচন হলেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন গত ৭ মাস ধরে। এই ৭ মাসে পানি নিষ্কাশনের জন্য পুরনো ড্রেন পরিষ্কার করা ছাড়াও ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৫ হাজার মিটার নতুন ড্রেন নির্মাণের কার্যাদেশ দিয়েছেন। নগরীর বর্জ্য নিষ্কাশনের জন্য ১৮৬ কিলোমিটার পাকা এবং ১৩৮ কিলোমিটার কাঁচা ড্রেন রয়েছে। নতুন ড্রেন নির্মাণ ও পুরনো ড্রেন সংস্কারের ২০ কোটি এবং নগরীর খাল পুনঃখনন ও সংস্কারের জন্য ৩৫ কোটি টাকার দু’টি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিরসন করা সম্ভব হবে। দখলদারদের ব্যাপারে তিনি বলেন নগরীর বিবির পুকুরপাড়সহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অস্থায়ী দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিটি করপোরেশন প্রধান প্রকৌশলী তারিকুল হক জানান, শহররক্ষা বাঁধের জায়গা বিআইডব্লিউটিএসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আর সড়ক নির্মাণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সিটি কর্পোরেশন শুধু সৌন্দর্য বর্ধনসহ কিছু কাজের তদারকি করেছে। তবুও এ সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে তালিকা করতে বলা হয়েছে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল নিজে উপস্থিত থেকে কাউনিয়া জানকিসিংহ রোডসহ কয়েকটি এলাকার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ‘নগর ভবনের’ জমি দখলমুক্ত করেছেন।
১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল পৌরসভা বিলুপ্ত করে ২০০১ সালে বরিশালকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করা হয়। তখন ২৫ বর্গ কিলোমিটার পৌর এলাকার সাথে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ইউনিয়নকে যুক্ত করে ৫৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে পথচলা শুরু হয় সিটি কর্পোরেশনের। বর্তমানে ৩০টি ওয়ার্ডে বাস করছেন ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। এরমধ্যে পৌরসভা আমলের এলাকাকে ঘিরেই উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হওয়ায় বর্ধিত এলাকার বাসিন্দারা থেকে গেছেন নাগরিক সুবিধার বাইরে।