বাবা অতি সরল ছিলেন

আমার বাবা খুব সরল ছিলেন। যে যত বেশি গরিব সে ততবেশি সরল। বাবা ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। অল্প বেতনের চাকুরে। সংসার ছিল খুব বড়। আমরা ছিলাম ছয় ভাই। আমাদের কোন বোন ছিলো না। মা বাবা দু’জনই খুব পরিশ্রম করতেন। মা একা হাতে সব সামলাতেন। ছেলেদের জন্য তিনবেলা নিজ হাতে রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা, বিছানা-বালিশ ঠিক করা— সব কিছু মা নিজ হাতে করতেন। বাবা সন্ধ্যার পর আমাদের লেখাপড়া করাতেন। লেখাপড়া না পারলে বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করতেন। ভয়ানক রাগ করতেন। উত্তেজনায় ছটফট করতেন। বাবা যেন রাগ না করে সে কারণ আমরা ভালো ছাত্র হয়ে গেলাম। স্যাররা জানতেন, আমরা গরিব কিন্তু ভালো ছাত্র। তাই তার বিনামূল্যে আমাদের প্রাইভেট পড়ার সুযোগ করে দিতেন। কারণ আমরা যে স্যারের কাছে পড়ব অন্য ছাত্ররাও সেই স্যারের কাছে পড়ার জন্যে ভিড় করে। বাবা খাওয়ার ব্যাপারে কৃপণ ছিলেন না। মাছ মাংস কিনতেন। মাসের শুরুর দিকে বেতন পাওয়ার পর বাবার ভাবটা থাকতো— যেন উনি একজন রাজা। প্রচুর খাদ্যদ্রব্য ও ফলফলাদি কিনতেন। খাওয়া বাদে অন্যান্য জিনিস কেনায় বাবার ছিলো চরম অনিহা। খাবার ছাড়া অন্য কোনো কিছুর প্রতি তার লোভ ছিল না। আমার অতি সরল পিতার একটাই আকাঙ্ক্ষা ছিল। তিনি মাথা গোঁজার মত একটা ঠাঁই তৈরি করবেন। তার নিজের একটা বাড়ি দরকার। মায়ের গয়নাগাটি বিক্রি করে মিরপুরের ভেতরে সামান্য একটু জমি কিনলেন তিনি। অতি অল্প দাম। এই এলাকাটা কোনদিন জনবসতি হবে ভাবা যায় না। আশেপাশে কয়েকটা মাটির ঘরে দু’চারজন বাস করে। তারা সবাই মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে। ওদের বলা হয় পাল। বাবার টাকা-পয়সা নাই। কিন্তু বাবা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন, তার নিজস্ব একটা বাড়ি হবে। বাড়িতে একটা উঠোন থাকবে। একটা পেয়ারা গাছ আর ঝাকড় মাকড় একটা বকুল ফুলের গাছ থাকবে। বাবা বিকেলে বকুলতলায় বসে চা-মুড়ি খাবেন। তার চোখের সামনে আমরা উঠোনে খেলাধুলা করব। শীতল পাটি বিছিয়ে লেখাপড়া করব। টিনের চৌচালা ঘর থাকবে দু’চারটা। চাপকলের পানি খাব। একটা ছোট্ট রান্নাঘর থাকবে। মোরগ-মুরগির খোয়াড় থাকবে। মোরগ-মুরগি ভোরবেলা কোকর কো ডাক দিয়ে আমাদের ঘুম ভাঙাবে। বাবার স্বপ্ন দীর্ঘ হতে লাগল। কিন্তু বাবার হাতে কোনো টাকা নেই। কাগজ-কলম নিয়ে বাবা নিজেই বাড়ির ড্রইং করতে থাকেন। কোথায় শোবার ঘর হবে কোথায় বসার ঘর হবে এইসব আর কি? বাবার খাট থাকবে জানালার ধারে। বাবা শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখবেন। নীল আকাশ বাবার খুব প্রিয়। মাঝে মধ্যেই বাবা মিরপুরের গোলারটেকে চলে যান। তখন এখানে তেমন জনবসতি গড়ে ওঠেনি। চারপাশে ফাঁকা জায়গা জমি। মাঠের পর মাঠ। পাশে বিস্তীর্ণ কবরস্থান। বিশাল মাঠগুলো কবরস্থানের জমি। এখানেই আছে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থান। বাবা নিজের একচিলতে জমিতে চুপচাপ বসে থাকতেন। একধারে ছোট্ট একটা অপুষ্ট পেয়ারা গাছ আছে। গাছে পেয়ারা ধরে না। গাছটাও বাড়ে না। আর একধারে আছে একটা সূর্যমুখী ফুলের গাছ। বাবা মাদুর পেতে চুপচাপ বসে থাকে। দু’একজন এলাকাবাসী বাবাকে সালাম দেন। চাচা, বাড়ি কবে বানাইবেন? বাবার সরল উত্তর। এই তো বাবা, কাম ধরুম। একটা ঘর বানাইলেই এইখানে আইসা পরুম। আর ভাড়া বাড়িতে ভালো লাগে না। হ হ চাচা-আইসা পড়েন। চারদিকে খোলা জায়গা জমি। শরীর ভালো হইয়া যাইবো চাচা। বাবা মাথা নাড়েন। তাদের সাথে তিনিও একমত। বাবা একা একা বসে বসে জমির হিসাব করেন। বড় ঘরটা কোথায় হবে? দক্ষিণে দরজা-জানালা রাখতে হবে। বকুল গাছটা কোথায় লাগানো হবে? চাপকলের ব্যবস্থা একটু দূরে রাখতে হবে। নরম মাটিতে চাপকল থাকলে পানির প্রবাহ ভালো থাকবে। এই রকম নানা হিসাব-নিকাশ করেন আমাদের সরল পিতা। কিন্তু তার কাছে সামান্য টাকা-পয়সাও নাই। টিনের ছাদ কিংবা এক গাড়ি ইট যে কিনবেন তেমন সামর্থ্যও তার নাই। কিন্তু তার মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার। নিজের একটা ঘর দরকার। কিন্তু সরল বাবা বুঝতেন না যে, পরের জাগা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই। নিজের ঘরে শুয়ে আকাশ দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি।