আমার কথা : শাফিকুর রাহী
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৪, ১৯:৪৫
যে বয়সে শিশুরা হেসে-খেলে বেড়ায়, কল্পনার ডানায় উড়ে বেড়ায় রূপকথার অপরূপ রাজ্যে- সেই বয়সে আমি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি ছিলাম। অবশ্য অতি কৈশোরে গ্রামের নৈসর্গিক আবহে আমার দিন কেটেছে। ধান ক্ষেত, বিস্তৃত খেলার মাঠ, স্রোতস্বিনী ঢেউ খেলানো গাঙের পাড়, দূরের বন থেকে পাখির ডাক— এসব আমাকে উদাস করেছে বারবার। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম বিধায় মাটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক জন্ম থেকেই। মা-বাবারা তার সন্তানকে ভালোবাসে, স্নেহ জড়ায়, শাসন করে। অসুস্থ হলে পাশে বসে চোখের জল ফেলে— এটা তো জগত্ সৃষ্টির পর থেকেই হয়ে আসছে। আমিও মা-বাবার স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বেড়ে উঠি। তবে প্রথম বই অনেক দূরের পাখি প্রকাশিত হওয়ার পর ভীষণ আনন্দে মনটা সারাদিন নাচানাচি করেছিলো। সে আনন্দের কথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। সর্বকর্মে ব্যর্থ মানুষের দুঃখভরা মলিন মুখেও আচমকা হাসির গোলাপ ফোটে।
১৯৭১। সে সময় আমি নবীন কিশোর। প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস। দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছে এটা বুঝি কিন্তু যুদ্ধটা কেমন তা টের পাইনি কারণ আমাদের অজগ্রামে পাকিস্তানী মিলিটারীরা ঢুকতে পারেনি। তবে রাজাকার দেখেছি। আমার মনে হয়েছে রাজাকার মানে পাকিস্তানী সরকারি বেতনভুক্ত কর্মচারীর মতো। কারণ আমাদের এলাকায় রাজাকাররা সকাল-বিকাল টহল দেয়ার ভাব-ভঙ্গি দেখে আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। যারা পিঠে বন্দুক নিয়ে টহল দেয় আর নিজের পায়ের মশা-মাছি তাড়ায় ঠাস-ঠাস চড় মেরে। তা এমন কয়েকজন রাজাকার— যাদের চিনতাম। দুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে থেকে রাজাকারদের গায়ে ঢিল ছুঁড়তাম। ওরা কে ঢিল মারে রে? বলে এদিক-ওদিক তাকাতো। আমরাতো ভোঁ দৌড়। ওই রাজাকারদের দেশ স্বাধীন হলে আর কোথাও দেখিনি। আমার উঠতি কৈশোরে নেমে আসে দুর্দশা। বাধ্য হয়ে বাড়িছাড়া হই। কিভাবে যে ঢাকায় চলে আসি এখনও ভেবে পাই না। এই ঢাকা আমাকে আজো তার স্বপ্নের জালে আটকে রেখেছে। আমার জীবন সংগ্রাম, পড়াশানা, লেখালেখি, সবই এই ঢাকাতেই।
আমি দেখেছি সাধারণ-সাদামাটা ঢাকা নগরী ধীরে ধীরে কিভাবে তিলোত্তমা হয়ে উঠেছে। ঢাকা আমার স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। শৈশবে দেখা মুক্তিসংগ্রাম এবং পরে শোনা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের একটি অংশ আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে বারবার— যেমন, “আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়” এবং “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”— বঙ্গবন্ধুর এমন বজ্র কণ্ঠ শুনে আমি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়ে উঠি। আমার প্রথম বই শিশু-কিশোরদের ছড়া-কবিতার বই অনেক দূরের পাখি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমী থেকে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয়। প্রথম লেখা ছাপা হয় ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ সম্পাদিত শৈবাল নাট্যচক্রের স্মরণিকায়, দুর্ভাগ্যের বিষয় আমি নিজে সেই লেখাটি ছাপা অবস্থায় দেখতে পাইনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সে লেখাটি সংগ্রহ করতে পারিনি। আমার যে বন্ধু লেখাটি নিয়েছিলেন, তার মুখে শোনা আমার কবিতাটি পড়ে ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ এডিট করে ছাপিয়েছিলেন এবং খুব প্রশংসা করেছিলেন। কিশোর বেলায় প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলাম ফটোগ্রাফার হবো, পরে স্বপ্ন দেখেছিলাম গিটার বাদক হবো। আসলে কোনোটাই আমার হয়নি। ফটোগ্রাফার হওয়ার স্বপ্ন আজো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। প্রিয় লেখা — আজো লেখা হয়নি। তারপরও যদি বলতেই হয় তবে বলবো নিজের কাছে নিজের পছন্দের লেখা— “মুক্তির অপ্রতিরোধ্য সংগ্রাম”।
বড়দের জন্য প্রায় কুড়িটির মতো কবিতার বই এবং কবিতা সমগ্র-১-২ বের হয়েছে। তারপরও আমি কিশোর ভাবনা থেকে সরে আসতে পারি না। আমার স্বপ্নময় শৈশব, কৈশোরের প্রারম্ভকাল আমাকে সবসময় তাড়িয়ে বেড়ায়। এজন্য শিশু সাহিত্যের প্রতি আমার আকর্ষণ দুর্নিবার। আমার দুর্ভাগ্য— বাবার মৃত্যুসংবাদটিও জানতে পারিনি। আমার দুঃখী মা’টি আজো বেঁচে আছে কি না তাও জানি না। নিজ জন্মমৃত্তিকাতে আর ফেরা হয়নি হালের দড়ি ছেঁড়া পিতার অবাধ্য রাখালের। মায়ের মুখ সবসময় চোখের সামনে ভাসে। আমি লিখি, কেন লিখি সে কথা আমিও ভাবি। আসলে লেখার মধ্যে আমি স্বপ্নকে খুঁজে ফিরি। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু আমার নিরন্তর প্রেরণার উত্স। শিশু-কিশোরদের বলবো, তোমরা জন্ম নিয়েই একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। কিন্তু যার জন্য আমরা স্বাধীনতা পেলাম তাঁকে জানতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই স্বাধীনতা— এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারলেই তোমরা দেশপ্রেমী হয়ে উঠবে। যে দেশকে ভালোবাসে কেবল সেই মানুষ। তোমাদের মানুষ হয়ে উঠতে হবে।
কবিতা-কিশোর কবিতা মিলিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় ৪৫টি— উল্লেখযোগ্য কিশোর কবিতা: মেঘ বলাকার ডানা, হাজার যুগের স্বপ্ন, মাগো আমি যুদ্ধে যাবো, পাখির ডানায় স্বপ্ন নাচে, চোখের তারায় মায়ের ছবি, কিশোর কবিতা সমগ্র-১-২।
পুরস্কার: ডা. লুত্ফর রহমান স্বর্ণপদক, দীপালোক গুণীজন সম্মাননা পদক, বাংলা সাহিত্য পদক ১৪১৬, মাতৃভাষা সাহিত্য পুরস্কার ২০১০, জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন পুরস্কার ২০১০, ভাষা বিশেষজ্ঞ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদক, কবি জীবনানন্দ সম্মাননা এবং মাদার তেরেসা স্বর্ণপদক।
আমি ১৯৬১ সালের ১ জুন ফেনীর গজারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। আমার বাবার নাম মো. মোবারক আলী, মায়ের নাম কুলসুমুন্নেসা। আমি ছোটদের জন্য লিখে বেশি আনন্দ পাই।