ভুল-নকলগুলোও ফিল্মি, তবে মুগ্ধতাগুলোও ফিল্মি ঢঙেই ছড়ালেন রাজ, তার ‘প্রথম’ চলচ্চিত্রে!
প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৪, ২০:৫৭
না, শিরোনামে আমি কোনো ভুল লিখিনি। অন্তত সিনেমার আমদর্শক হিসেবে এমনটা বলতেই পারি যে, এটিই তার প্রথম চলচ্চিত্র। নির্মাতার নির্মিত তৃতীয় এবং রিলিজকৃত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘তারকাঁটা’ দেখতে যখন হলে আসন গ্রহণ করলাম তখনই এটা মনে হলো। শুরুতেই ‘স্বদেশ’ ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর শুনে কানটাকে বন্ধ রাখলাম খুব ইতিবাচক হয়ে দেখার চেষ্টা করব বলে। পারলাম কই! তবে মুগ্ধ করে রাখল অসাধারণ ক্যামেরার কাজ! ইদানীং সিনেমার তরুণ শিল্পী-নির্মাতারা গা বাঁচানোর জন্য বলা শুরু করেছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের জন্য যেন তর্ক না করি। কিন্তু আলোচনা-সমালোচনাহীন সমাজ যে আরও নষ্টের রাজ্যে পরিণত হয় এই চিরায়ত সত্য ওদের কে বুঝাবে। যাই হোক ‘প্রজাপতি’ দেখার পর খুঁজতে হয়েছিল কেন রাজের ‘প্রজাপতি’কে আমাদের সিনেমা বলতে হবে। এবারে তিনি সত্যিকার অর্থেই সিনেমা বানিয়েছেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, কারো প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে কোনো নির্মাতার ছবির টেলপে অনুরোধ প্রচারের সুযোগ থাকে না যে, ‘ভাই ও বোনেরা এটি আমার প্রথম চলচ্চিত্র, তাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।’ কারণ এ ধরনের মানবিক আবেদনে গাঁটের পয়সা খরচ করে কেউ সিনেমা দেখতে বসে না! শুরুতেই দুর্দান্ত সিনেমাটোগ্রাফি, নায়কের এন্ট্রি, ভিলেনবাজি... পরিমিত স্লোমোশন ইত্যাদি মুগ্ধ করে। নড়েচড়ে বসায় দর্শককে। মুখ দিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত অনুচ্চারিত শব্দ ছিল ‘বাহ্’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেন এই ‘বাহ্’-কে ‘আফসোসের বাহাস’-এ পরিণত করলেন সেটা খুব জানতে ইচ্ছে করে। রাজ অসাধারণ অভিনয় করিয়েছেন প্রত্যেককে দিয়ে। শুধু ফারুক আহমেদের অযথা কমেডিয়ান মার্কা হাসি, তার কেরানিসুলভ ড্রেসআপটুকু বাদ দিলে কাস্টিং মন্দ না। আর গানের ক্ষেত্রে দারুণ কিছু গান উপহার দিয়েছেন রুমি। ‘শূন্য শূন্য লাগে’, ‘তুমি জোসনা হলে আমি রাত গহীন’—অনবদ্য দুটি গান। কিন্তু এক্ষেত্রেও পাশের এক মহিলা দর্শক খানিক ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, ‘দেখ গিয়ে, রুমি হয়তো এটাও কোনো গান থেকে মেরে দিয়েছে!’ হায়রে বেচারা রুমির ইমেজ! তবে, এ দুটি সত্যিকার অর্থেই দারুণ গান। এর বাইরে ছবিতে সত্যি সত্যিই দুটি গান প্রায় হুবহু নকল করেছেন রুমি। আরফিন রুমী থাকবে আর সেখানে গানের নকলবাজি, চৌর্যবৃত্তি হবে না—এটুকু প্রত্যাশাও অবশ্য করিনি। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেশ কিছু স্কোর সরাসরি এ আর রহমান, প্রীতম থেকে কাট-কপি পেস্ট। একই সাথে গানের পাশাপাশি, দারুণ কিছু সংলাপ আর ভিডিওজুড়ে দিয়ে আজকাল যে ব্যয়বহুল ভিডিও তৈরি হয়, সেই হিসেব কষলে দারুণ কিছু মিউজিক ভিডিও জোড়ালাগানো ছবি যদি এটাকে বলি—তারপরও বলতে হয় শতভাগ উপভোগ্য ভিডিও ছবি ‘তারকাঁটা’ তিনি উপহার দিয়েছেন।
এছাড়া সবচেয়ে বড় মুগ্ধতা চিত্রগ্রহণে, মীমকে দারুণভাবে উপস্থাপন, শুভকেও। এছাড়া রাজ এ ছবিতে দারুণ এক উদাহরণ তৈরি করলেন, তা হলো কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং। আমাদের সিনেমায় যা খুব জরুরি ছিল। তিনি দারুণভাবে প্রোডাক্টগুলোর ওপর আলো ফেলানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও মনে হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখানোর জন্য আজগুবি নায়িকাকে নিয়ে গেছেন, হাসপাতালের ক্যাম্পেইনের জন্য হঠাত্ বলা নেই কওয়া নেই অসুস্থ করে দিলেন মৌসুমীকে। মনের ভেতরে তাই বারবার মোচড় দিল গল্প খুঁজতে গিয়ে। কেন এটা করলেন তিনি? ছবিতে গানের ভিডিওগুলো দেখতে দেখতে শেষে নিজেই খুঁজতে হলো, এই ছবিটির নাম কী যেন? কেন এই নাম? কোন অর্থে? কোন যুক্তিতে এই ছবির নাম ‘তারকাঁটা’। শুধুমাত্র পারভেজের কণ্ঠে একটি গানে বারকয়েক ‘তারকাঁটা’ উচ্চারণ ছাড়া এর মোরাল অব স্টোরি তো খুঁজে পেলাম না।
দূরে সামনের সারির এক তরুণ দর্শক জোরসে তার বন্ধুকে বলে উঠলেন, ‘ধুর দোস্ত তোকে আশিকীর ডিভিডি কিনে দিচ্ছি বাসায় চল, আসলটা দেখবি। টাকার কি দাম নাই!’ বলে হল থেকে উঠে চলে গেল প্রথম বিরতিতেই। আমি কসরত করে তবুও ইতিবাচক কিছু খোঁজার চেষ্টা করছি তখনও। যে আমি সেই কৈশোরের স্কুল পালিয়ে শহীদুল ইসলাম খোকন, কাজী হায়াত, এজে মিন্টুর ছবি দেখতাম। তখন হলের প্রিন্ট খারাপ ছিল। দেখা যেত সিনেমা পর্দায় দাগে ভর্তি, মফস্বলের হলে শব্দও এতটা স্পষ্ট ছিল না। তারপরও সিট থেকে উঠে যেতে ইচ্ছে হতো না। গল্প আটকিয়ে রাখত শরীর। একটা ক্লাইমেক্সের পর আরেক ক্লাইমেক্স দেখার জন্য মন কেমন কেমন করত।
কিন্তু ‘তারকাঁটা’য় স্বামীহারা বোন মৌসুমীর ঘরে কেন আজন্ম দরজা খোলা? সারাক্ষণ নির্মাতা মৌসুমীকে দিয়ে শুধু ইন আউটই করালেন। মৌসুমী কী করেন, কী দিয়ে চলে তার সংসার, দুই কমেডিয়ানকে ভিলেন হিসেবে চমক দেখাতে গিয়ে নির্মাতা ভুলেই গেলেন তাদেরও একটা গল্প দেখানো দরকার। তাদের গ্যাংয়ের উদ্দেশ্য বিধেয় কী? শুধু যেন নায়ক আরেফিন শুভর প্রেমিকা, বোন আর ভাগ্নিতে ধারাবাহিকভাবে ধরে আনাই যেন কাজ। মীম-শুভর প্রেমের রসায়ন কোথায়? বরং মনে হলো জোর করে গানের সিকোয়েন্স মেলানোর জন্য সংলাপ বসানো হয়েছে। ছবিতে তাই দারুণ গান হচ্ছে কিন্তু সেগুলো দারুণ মিউজিক ভিডিও ছাড়া কিছু ভাবা যাচ্ছে না, মৌসুমী সারাক্ষণ চোখে অশ্রুসিক্ত থাকছেন কিন্তু আমদর্শক হিসেবে মন তো পোড়াচ্ছে না, মোটামুটি দরের অ্যাকশন চলছে দু একবার, কিন্তু ভিলেনের উপর রাগ করে ভেতর থেকে শত চেষ্টাতেও বলতে পারছি না—‘মার হারামিকে মার!’ শুধু ডা, এজাজের সহকারী ভিলেনের তোতলামিতে হেসেছি বার কয়েক। তবে কেন এই গল্পহীন, আশিকী টু, বর্ডিগার্ডসহ পরিচিত কিছু ছবির দুর্বল সিকোয়েন্স কাট কপি করতে গেলেন। নাট্যনির্মাতা হিসেবে যে নির্মাতা এত দারুণ দারুণ কনসেপ্টে মোহমুগ্ধ করেন, তিনি কেন গল্পহীন একটা ছবি দিয়ে খেই হারিয়ে ফেলবেন! তাই যেটুকু ভালো ওটুকুতে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর না তুলে শুধরানোটা জরুরি। কারণ এখনকার দর্শক তো আমাদের কৈশোরের সময়কার চেয়ে হাজার গুণে সচেতন!
শেষে একটি চিত্রকল্প :মাত্র বছর দশেক আগেও ওপার বাংলার বা বলিউডের কেউ কেউ ঢাকার সিনেমা পাড়ায় আসতেন আমাদের ছবির গল্পের কপিরাইট কিনতে। এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। ধরা যাক বিশ্বায়ন ও চলচ্চিত্রের যৌথ খামার প্রকল্পের এই সময়ে রাজ তার এই ছবিটিকে বগলবন্দী করে ওপার বাংলা বা মুম্বাইয়ের দিকে ছুটলেন। বলিউডের কয়েকজন নির্মাতা-প্রযোজককে ছবি দেখানোর পর, তাকে কি আর সহজে দেশে ফেরানো যাবে? আশিকীর চিত্রনাট্যকার তাকে হয়তো আটকাবেন, দু-তিনজন সংগীত পরিচালক তাকে চেপে ধরবেন। হয়তো বলবেন, ‘ভাই, আপনি কোন চোরকে দিয়ে মিউজিক করিয়েছেন ধরে নিয়ে আসুন। হুবহু ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর কীভাবে মেরে দেবার সাহস করে সে! ওকে আগে বাঁধব।’ শেষে কোনো কোনো প্রযোজক বলতে পারেন, ‘ভাই এতকিছু্ই যখন করলেন, তখন অমুক অমুক ছবির ছায়া অবলম্বনে এই ক্রেডিট কেন দিলেন না! আর যখন দেননি তখন কপিরাইটের টাকাটা দিন।’ তখন রাজকে ছুটিয়ে আনার জন্য সাংবাদিক বা তার শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমাদের কী কী যুক্তি দিয়ে, কী কী উপায়ে সম্মানের সাথে ফেরত আনা যাবে তা হয়তো রাজ ভালো বলতে পারবেন। শেষ পরিচ্ছদটি জোকস অ্যাপার্ট বলে ঘটনাটি গল্পের প্রকারান্তরে ফেলে দিয়ে এই বিষয়গুলোর লজ্জা আর ভুলগুলো শুধরে রাজ তার আগামী ছবিতে আরও সমৃদ্ধ হবেন। এটাই প্রত্যাশা। যেমনটা ‘প্রজাপতি’ নাটক থেকে উের অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির ফিল্ম নির্মাতা হিসেবে উন্নীত হলেন এই ছবিতে। তেমনি প্রত্যাশার মাত্রা আরও অনেকগুণ বাড়িয়ে রাখলাম তার আগামী ছবির জন্য।
অসাধারণ
১.সিনেমাটোগ্রাফি ২. শিল্পীদের অভিনয় ৩. কমেডি
বিরক্তি
১. গল্পহীনতা ২. ফারুক আহমেদের অভিনয় ৩. ককটেল নকলবাজি