বৈষম্য রোধে বাজেটের বরাদ্দ আরো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন

প্রস্তাবিত ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরের বাজেটের উপর এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, আর্থিক, সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্য রোধে বাজেটের বরাদ্দ আরো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। বাজেট বাস্তবায়নে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। প্রতিবছর ‘জেন্ডার বাজেট’ প্রণয়ন করা হলেও এ বাজেট থেকে নারীরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন তা নির্ণয় করা হচ্ছে না। যে কারণে বাজেটে বৈষম্য রোধের বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে দৈনিক ইত্তেফাক, পাক্ষিক অনন্যা ও ক্লিক ইত্তেফাক ডট কমের উদ্যোগে এ গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়। দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সঞ্চালনায় ‘বৈষম্য রোধে বাজেট’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রস্তাবিত বাজেট বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান ও সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলমসহ নারী উদ্যোক্তা ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। রুশিদান ইসলাম রহমান বলেন, বাজেট হলো উন্নয়ন দর্শন; কিন্তু প্রতিবছর যে বাজেট হচ্ছে তা গতানুগতিক। উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে বৈষম্য রোধে বাজেটে উল্লম্ফন প্রয়োজন। বিনিয়োগ ছাড়া বৈষম্য ও দারিদ্র্য হ্রাস সম্ভব নয়। তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধি ও বেসরকারি বিনিয়োগ হারে স্থবিরতার পর এবারের বাজেটে প্রয়োজন ছিল উদ্যমী, ব্যতিক্রমী ও মরিয়া ধাঁচের কৌশল, সেটি দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈষম্য দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। শিক্ষা, নারী-পুরুষ, শহর-গ্রাম ও অঞ্চল ভেদে বৈষম্য সবচেয়ে বেশি। এ বৈষম্য দূর করতে হবে। বৈষম্য রোধে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কারণ এ খাতগুলোতে বেশি কর্মসংস্থান হয়ে থাকে। অন্যদিকে বৈষম্য রোধের আরেকটি বড় উপায় হলো শিক্ষা। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার মাধ্যমেই প্রকৃত বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব। তাই শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। গত তিন বছর ধরে ক্ষুদ্র শিল্পে প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। এ বিষয়ে প্রতি বছরই এসএমই রিফাইন্যান্সিং-এর কথা বলা হয়, এবারেও তাই করা হয়েছে- নতুন কিছু নেই। সিপিডি রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, গত কয়েক বছরে সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল ছিলো। সেই সাথে মুদ্রার মানও ছিলো স্থিতিশীল; কিন্তু একই সাথে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। এটি একটি বড় শঙ্কার জায়গা। বেসরকারি বিনিয়োগ দ্রুত কমে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে নিয়ে যেতে হলে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য আগামী বছর ব্যক্তিখাতে বাড়তি ৭৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। আগামী অর্থ বছরে তেল আমদানির ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে ভর্তুকি কমানো হয়েছে। এতে আগামীতে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে। বিআইডিএস সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, একদিকে বলা হচ্ছে বাজেট নারীবান্ধব হয়েছে, অন্যদিকে বাজেটে নারীর অংশ ধারাবাহিকভাবে কমে যাচ্ছে। এসএমই ঋণের ১৫ শতাংশ নারীকে দেয়ার কথা। কিন্তু নারীদের ওই কোটা পূরণ হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, নারী উদ্যোক্তার অভাবেই কোটা পূরণ করা যাচ্ছে না। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিফলন সাধারণ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম বলেন, যে দেশে দ্রুত প্রবৃদ্ধি হয় সেখানে বৈষম্যও দ্রুত কমে আসে। গত কয়েক বছরে আমাদের বাজেট আরো উচ্চাভিলাষী হওয়া উচিত ছিল। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের জীবনমানের অনেক উন্নতি হয়েছে। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে সব খাতে খরচ বাড়ছে। তাই বাজেট ছোট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি আরো বলেন, এই বাজেট দরিদ্রবান্ধব। রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির জন্য কোনো সমস্যা নয়। হরতাল-অবরোধের পরও গত অর্থবছরে রপ্তানি ১৪ শতাংশের বেশি হয়েছে। বিগত সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতায়ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। যারা এ বাজেটকে ‘লক্ষ্য বিলাসী’ বলেছেন তারা মূলত ‘কথা বিলাসী’ বলে মন্ত্যব্য করেন তিনি। ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ও পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক তাসমিমা হোসেন বলেন, বৈষম্য প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দেয়। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ছাড়া জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। এতবেশি জনসংখ্যার দেশে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য রেখে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে সে লক্ষ্য রয়েছে, তবে বাজেট কতটা বাস্তবায়ন হচ্ছে তা মনিটরিং-এর ব্যবস্থা যদি থাকতো তাহলে জনগণের কাছে বিষয়টি স্পষ্ট হতো। আমরা মনে করি, বাজেট মনিটরিং-এর ব্যবস্থা রাখা জরুরি। মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য সারাহ বেগম কবরী বলেন, সমালোচনা না করে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে চাপ দিতে হবে। সবধরনের বৈষম্যের নিন্দা করে তিনি পুরুষদের আরো সহনশীল এবং নারীদের আরো এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। নারীনেত্রী সালমা খান বলেন, নারীর প্রতি বৈষম্য দূর হওয়ার মতো বাজেট হচ্ছে না। প্রতিবছর যে জেন্ডার বাজেট দেয়া হয় তার কতটুকু প্রকৃতভাবে নারীরা পেয়ে থাকে তা নির্ণয়ের আহ্বান জানান তিনি। ব্যারিস্টার রুহিন ফারহানা বলেন, পানির দাম বাড়ছে, বাইসাইকেল, ট্রেন-সেবার দাম বাড়ছে। বাজেট যদি দরিদ্রবান্ধবই হবে তাহলে এসব পণ্য ও সেবার দাম কেন বাড়ছে? নারী উদ্যোক্তা হাবিবা মাহমুদ বলেন, যখন সুশাসন থাকে তখন নারীরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। বাজেটে অবশ্যই উদ্যোক্তাদের জন্য কিছু করা উচিত। কারণ উদ্যোক্তারা মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা, বলধা গ্রুপের সিইও ফারাহ এম সাদ্দাহ, ফারুখ ফয়সাল, উন্নয়ন পরামর্শক ফেরদৌসী, জিকেএস প্রকল্পের প্রতিনিধি সেলিম জাহাঙ্গীর প্রমুখ।