হারবাল টনিকে ভায়াগ্রা, ক্যাপসুলে আটার গুঁড়া
প্রকাশ : ১১ জুন ২০১৪, ২২:৫৩
ভিটামিন, ফুড সাপ্লিমেন্ট ও হারবাল টনিক-এর নামে ভেজাল ওষুধে সয়লাব হয়ে গেছে দেশের ওষুধ বাজার। জানা গেছে, ফার্মেসিতে মনোরম মোড়কে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন বিদেশি ভিটামিন ও ফুড সাপ্লিমেন্টের শতকরা ৯৯ ভাগই নকল। বিদেশি ভিটামিনের আদলে দেশেই একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী এ ধরনের ভিটামিন ও ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছে। অনেক ভিটামিন ক্যাপসুলে পাওয়া যাচ্ছে আটার গুঁড়া, ট্যালকম পাউডার বা নিম্নমানের ক্যালসিয়াম। আর এসব চটকদার নকল ভিটামিন প্রতি কৌটা ৫শ থেকে হাজার-বারশ টাকায় কিনে প্রতারিত হচ্ছেন রোগীরা। শুধু তাই নয়, দেশের বেশিরভাগ আয়ুর্বেদিক ও হারবাল কোম্পানির তৈরি হারবাল টনিক ও এনার্জি ড্রিংকসের মধ্যে পাওয়া গেছে ভায়াগ্রা জাতীয় উত্তেজক ওষুধের উপাদান সিলডিনাফিল ও টাডানাফিল। আর মাশরুম দিয়ে তৈরি ক্যাপসুল বিক্রি করা হচ্ছে ক্যান্সার নিরাময়ী, শক্তিবর্ধক মেডিসিন হিসাবে। ঢাকার মহাখালীস্থ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন খোদ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।
গত মঙ্গলবার ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে রিপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে জীবাণুবিদ ও ড্রাগ এনালিস্ট ডা. মো. এবি সিদ্দিক ‘নিউট্রি এ-জেড’ নামের একটি ভিটামিন ক্যাপসুল ভেঙ্গে দেখান- ক্যাপসুলের ভিতরে রয়েছে আটার গুঁড়া। দেশের অন্যতম শীর্ষ একটি এলোপ্যাথিক ওষুধ কোম্পানির তৈরি মাল্টি ভিটামিন-এর অনুরূপ কৌটার মধ্যে ভরা হয়েছে আটার গুঁড়ার এই ক্যাপসুল। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এসব নকল ও মারাত্মক ক্ষতিকর প্রডাক্টের মোড়কে অনেকে ব্যবহার করছে বিএসটিআই অথবা সায়েন্স ল্যাবরেটরি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম। তবে এ ব্যাপারে বিএসটিআই-এর একজন কর্মকর্তা জানান, এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র শুধু প্রডাক্ট নকল করছে তাই নয়, এরা বিএসটিআই-এর মনোগ্রামও জাল করছে। এদের কোন ঠিকানা নেই। এদের কোন ফ্যাক্টরি বা অফিসেরও অস্তিত্ব নেই। এদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা বিভাগের সাঁড়াশি অভিযান চালান দরকার। আর সরকারের ওষুধ প্রশাসন এদের নাম দিয়েছে ‘ডিব্বা পার্টি’। কারণ এই জালিয়াত চক্রটি শুধু ডিব্বা বা কৌটা আমদানি করে। ভিতরের উপাদান ও মোড়ক লাগায় দেশে। এর পুরাটাই নকল। এধরনের জালিয়াতি ফরমালিনের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির রিপোর্টে দেখা যায়, বাজারে অহরহ বিক্রি হচ্ছে এমন হারবাল সিরাপ জিন্টার প্লাস জিনসিন, সেভেন হর্স পাওয়ার মিক্সড ফ্রুট ড্রিংকস, জিংরাজ সিরাপ, রাজ হারবাল টনিক, লায়ন ফ্রুট ড্রিংস, হর্স ফিলিং প্লাস, হট জিনসেনসহ অসংখ্য টনিক ও এনার্জি ফ্রুট ড্রিংকসে ভায়াগ্রা জাতীয় ওষুধের উপাদান সিলডেনাফিল ও টাডানাফিল পাওয়া গেছে। আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, এ ধরনের হারবাল টনিক সেবন করতে বলা হচ্ছে প্রতিদিন ১২ থেকে ২০ চামচ পর্যন্ত। যা সেবনে কিডনি ও লিভার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান।
এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল ডা. জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক ইত্তেফাককে বলেন, এসব ফুড সাপ্লিমেন্টের শতকরা ৯০ ভাগই নকল। আর একই অধিদপ্তরের অপর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অভিমত, ৯৯ ভাগ বিদেশি ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ভিটামিনই নকল। তিনি জানান, চীন ও ভারত থেকে চটকদার কৌটা আমদানি করে রঙিন মোড়ক লাগিয়ে এসব নকল ও ভেজাল ফুড সাপ্লিমেন্ট ওষুধের দোকানে বিক্রি করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষ ওষুধ কোম্পানিগুলোর মাল্টি ভিটামিন যেখানে দেড়-দুইশ টাকায় পাওয়া যায়, সেখানে এসব নকল ভিটামিন বিক্রি হচ্ছে ৪শ টাকা থেকে হাজার-বারশ টাকায়। গুলশান, ধানমন্ডিসহ সব অভিজাত এলাকার ওষুধের দোকানেই শোভা পাচ্ছে এসব নকল বিদেশি ফুড সাপ্লিমেন্ট ও ভিটামিন।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল সূত্র জানান, নগরীর ব্যস্ততম এলাকা বঙ্গবন্ধু এভিনিউর একটি ভুয়া কোম্পানি মাশরুম ক্যাপসুলকে যৌন উত্তেজক ওষুধ হিসাবে এক ফাইল ২ থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করছিল। ওই কোম্পানির কারখানা সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। মিরপুর ও জিনজিরাতেও এধরনের নকল কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া হারবাল টনিকের বাণিজ্য নিয়ে পাওয়া গেছে আরো উদ্বেজনক তথ্য। ভায়াগ্রার উপাদান মিশ্রিত এসব হারবাল টনিক ওষুধের দোকানের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে বস্তি এলাকায়, মুদি দোকানে। সরল প্রাণ মানুষ শক্তিবর্ধনের নামে উচ্চমূল্যে কিনছে এসব ক্ষতিকর টক্সিক উপাদান বা বিষ।
হারবাল সেভেন হর্স মিক্সড ফ্রুট এনার্জি ড্রিংকস-এর বোতলের মোড়কে লেখা আছে এটি রেডিক্স জিনসিন, মাশরুম, স্যাপ্রন, চীনাবাদাম, ভিটামিন-ই ইত্যাদিসহ ২১টি হারবাল উপাদানে তৈরি। অথচ ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরির এনালিস্ট ডা. এবি সিদ্দিক ইত্তেফাককে বলেন, পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই হারবাল ড্রিংকসে কালারিং এজেন্ট, ফ্লেভার, চিনি ও উত্তেজক ওষুধ সিলডিনোফিল (ভায়াগ্রা) ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি বলেন, ভায়াগ্রা মিশ্রিত এসব হারবাল টনিক অত্যন্ত বিপজ্জনক।
এদিকে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অভিযোগ, একশ্রেণীর চিকিত্সকও নিম্নমানের ও নকল এসব ভিটামিন ও ফুড সাপ্লিমেন্ট ব্যবস্থাপত্রে লিখছেন। তবে কোন চিকিত্সক যেন নিবন্ধনবিহীন এসব ওষুধ রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে না লেখেন, সে ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন থেকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন-বিএমএ সভাপতির কাছে শিগগিরই চিঠি পাঠানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।