বাড়ি ভাড়া ব্যাংকে :চাপ পড়বে ভাড়াটিয়ার ঘাড়ে!

বাড়ি ভাড়া ব্যাংকে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতায় নানামুখী হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে। বাড়িওয়ালাদের কাছ থেকে প্রাপ্য প্রকৃত রাজস্ব সরকারের ঘরে আনতে এই উদ্যোগ নেয়া হলেও এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এনবিআর কঠোর হলে বাড়ি ভাড়া ফাঁকি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়বে ঠিক। কিন্তু অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব বোর্ডের বাড়তি এই চাপ চলে যাবে ভাড়াটিয়ার ঘাঁড়ে। কারণ কর বাবদ প্রদত্ত বাড়তি টাকা বছরশেষে বাড়ি ভাড়ার সঙ্গেই যুক্ত করবেন বাড়ির মালিক। অথচ বাড়তি করের ভার বহনকারী বেশিরভাগ ভাড়াটিয়ার হয়তো করযোগ্য আয়ই নেই। তারা বলছেন, এ থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে বাড়ি ভাড়া ব্যাংকে দেয়ার শর্তের পাশাপাশি বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনকে যুগোপযোগী করে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তাহলে রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি অস্বাভাবিক বাড়ি ভাড়া থেকেও রেহাই পেতে পারেন ভাড়াটিয়ারা। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ব্যাংকে বাড়ি ভাড়া আদায়ের উদ্যোগটি ভালো। কিন্তু এটি কঠোরভাবে কার্যকর করতে গেলে সরকারকে দেয়া রাজস্ব বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর মাধ্যমে আদায় করে নেয়ার প্রবণতা তৈরি হবে। ঢাকা শহরের মত এলাকার ভাড়াটিয়াদের বিকল্প না থাকায় এটি তারা মেনে নিতে বাধ্য হবেন। ফলে এতে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে ভাড়াটিয়া ঐক্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির আহ্বায়ক বাহারানে সুলতান মনে করেন, ব্যাংকে বাড়ি ভাড়া আদায়ের এই নিয়মটি কার্যকরের সাথে সাথে বিদ্যমান বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন সংস্কার করে তাও কার্যকর করতে হবে। নয়তো বাড়িওয়ালা তার আয়ের অঙ্ক ঠিক রাখার স্বার্থে সরকারকে দেয়া করের টাকা বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর মাধ্যমে আদায় করে নেবেন। বাড়ি ভাড়া ব্যাংকে পরিশোধের বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, করজাল বৃদ্ধি, কর ফাঁকি রোধ এবং বাড়ি ভাড়া আদায়ে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বাড়ি ভাড়া ও সার্ভিস চার্জ উভয়ই হিসাবভুক্ত হবে। অর্থাত্ কোন বাড়ির মোট ভাড়া প্রাপ্তি ২৫ হাজার টাকার বেশি হলেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। বর্তমানে ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। মাসে ২৫ হাজার টাকা হিসেবে বাড়ি ভাড়া হিসেবে বা গৃহসম্পত্তি খাতে বার্ষিক আয় দাঁড়ায় ৩ লাখ টাকা। অর্থাত্ কোন বাড়ির মালিকের বাড়ি ভাড়া বাবদ নিট আয় ২৫ হাজার টাকা হলেই তাকে কর দিতে হবে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বাড়ি ভাড়া ব্যাংকে নেয়ার বিষয়ে এখনো কিছু কাজ চলমান রয়েছে। সংসদে প্রস্তাবটি পাস হলে তা আগামী মাস থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। বাড়ি ভাড়া সংক্রান্ত লেনদেনের জন্য ব্যাংকে আলাদা ফরমে আলাদা হিসাব খোলার ব্যবস্থা হবে (ডেডিকেটেড অ্যাকাউন্ট)। এই হিসাবে ভাড়াটিয়ার টাকা জমা দেয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাড়িওয়ালা চাইলে ভাড়াটিয়ার কাছ থেকে টাকা আদায় করে তিনি নিজেও ব্যাংকে জমা দিতে পারবেন। এ বিষয়টিকে কীভাবে আরো সহজ করা যায় তা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়েছে। আরো এক বা একাধিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) সৈয়দ আমিনুল করিম এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, গৃহসম্পত্তি খাত থেকে প্রকৃত আয় না দেখানোয় ব্যাংকের মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এই ব্যবস্থায় কর আদায় বাড়লে ঐ চাপ ভাড়াটিয়ার উপর পড়বে বলে তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এটি অমূলক নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে। বেশিরভাগ বাড়ির মালিক কর ফাঁকি দিচ্ছেন বলে দীর্ঘদিন থেকেই অভিযোগ তুলে আসছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন। এনবিআর একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১ লাখ ৬৩ হাজার বাড়ির মালিকের কোন কর সনাক্তকরণ নম্বরই (টিআইএন) নেই। আবার যাদের টিআইএন আছে তারা গৃহসম্পত্তি হতে নিট আয় কম দেখানোয় কম কর দিতে হয়। এমনকি অনেকের করযোগ্য আয়ই আসে না। আমিনুল করিম বলেন, চলতি অর্থবছরে গৃহসম্পত্তি খাতের আয়ের কর বাবদ প্রায় ২৫০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হবে। বাড়ি ভাড়া ব্যাংকের মাধ্যমে দেয়ার নিয়ম বাস্তবায়ন হলে এটি কয়েকগুণ বাড়বে বলে আশা করছে এনবিআর।