ভিলেন থেকে অমরত্বের পথে

পুরো ব্রাজিল, এমনকি গোটা বিশ্বই অপেক্ষায় ছিল তার জ্বলে ওঠার। কিন্তু এ কি? ২৬ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার লুকা মড্রিচের মুখে আঘাত করে রীতিমতো লাল কার্ড পাওয়ার উপক্রম করেছিলেন নেইমার। শেষ পর্যন্ত হলুদ কার্ড পেয়ে বেঁচে গেলেন। নেইমারের ‘ভিলেন’ হয়ে ওঠার গল্পটা সেখানেই শেষ। বাকি গল্পটা তার নায়ক হয়ে ওঠার। শুরুর কুকীর্তির দু’মিনিট বাদেই ২২ বছর বয়সীর ঝলক। ৪০ গজ দূর থেকে পরাস্ত করলেন ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক স্টাইপ প্লেতিকোসাকে। শুরু হল নেইমারের রাজত্ব। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে করেছেন আরও একটি গোল। বিশ্বকাপের শুরুর দিনই টুর্নামেন্টটিকে নিজের করে নেয়ার আভাস দিয়ে দিলেন ক্ষুদে এই তারকা। নেইমার নিজেও একে স্বপ্নের মত এক সূচনা বলেই মানছেন। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্ত পার করছি। এভাবে বিশ্বকাপ শুরু করাটা আমার স্বপ্ন ছিল। গোটা দলই প্রশংসার দাবি রাখে। যেভাবে আমরা ম্যাচের চেহারা বদলে দিয়েছি সেটা সত্যিই অসাধারণ।’ জাতীয় দলের হয়ে ৫০ ম্যাচে ৩৩ গোল করে নেইমার এখন জেয়ারজিনহো ও রোনালদিনহোর সাথে এক কাতারে অবস্থান করছেন। একই সাথে রিভালদোর ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। রিভালদো গোটা ক্যারিয়ারে আন্তর্জাতিক গোলের সংখ্যা ৩২টি। বার্সেলোনার এই স্ট্রাইকারকে নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর উচ্ছ্বাস আরও এক ধাপ উপরে। তাদের অনেকের মতে নেইমার অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দিয়ে ছাড়িয়ে গেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার পেলেকে। ব্রাজিলের শীর্ষ ক্রীড়া দৈনিক ও গ্লোবো লিখেছে, ‘বিশ্বকাপের অভিষেকে এমন পারফরম্যান্স পেলে কিংবা রোনালদো কারোই ছিল না।’ ১৯৫৮ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে পেলে জ্বলে উঠেছিলেন কোয়ার্টার ফাইনালে গিয়ে। গারিঞ্চা সেবার কোন গোলই পাননি। অভিষেক বিশ্বকাপে (১৯৯০) রোমারিওর পারফরম্যান্সও ছিলেন অনুজ্জ্বল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদোও প্রথম ম্যাচে গোল পাননি। সেদিক বিবেচনায় নেইমার ছাড়িয়ে গেছেন এদের সবাইকেই। সেজন্যই কি না বিশ্বকাপের শহর সাও পাওলোর অন্যতম প্রধান দৈনিক পত্রিকা ফোলহা ডি সাও পাওলো লিখে দিয়েছে ‘ও ক্র্যাকে’ অর্থাত্, ‘টেক্কা’! শুধু ব্রাজিলেই নয়, গোটা বিশ্বের চিত্রটাও এমনই। কাতালান স্পোর্টস দৈনিক এল মুন্ডো দেপোর্তিভো পেলের ডাক নাম ‘ও রেই’-এর সাথে মিলিয়ে নেইমারের নাম দিয়েছে ‘ও নেই’। তারা আরও বলেছে, ‘নেইমারের প্রথম গোলের পরই মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল ব্রাজিল।’ আরেকটি কাতালান ক্রীড়া দৈনিক স্পোর্টের হেডলাইন ছিল ‘নেইমারে উদ্ভাসিত ব্রাজিলের সূচনা’। ফ্রান্সের ‘ল্য’কুইপ’ লিখেছে ‘নেইমারে বাঁচলো ব্রাজিল’। ইতালির শীর্ষ ক্রীড়া দৈনিক লা গ্যাজেট্টা ডেল্লো স্পোর্টের লেখা ছিল অনেকটা এরকম — ‘এখন থেকেই এটা নেইমারের বিশ্বকাপ’। গত মৌসুমের শুরুতে যোগ দেন স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনায়। সেখানে শিরোপাহীন এক বছর কাটানোয় নিজের প্রথম বিশ্বকাপটাই নেইমারের জন্য হয়ে উঠে বড় একটা চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জের প্রথম ধাপটা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই পাড় করে দিলেন নেইমার। নিজে জ্বলে ওঠার সাথে সাথে ব্রাজিলও উদ্বোধনী ম্যাচে জিতে গেল ৩-১ গোলে। নেইমারের প্রসঙ্গে সবচেয়ে মোক্ষম কথাটা লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান — ‘কেবল ব্রাজিলের জন্যই নয়, নেইমারের আলো ছড়ানোটা গোটা টুর্নামেন্টের জন্যই জরুরি। পাস দেয়ার সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণে কিছুটা অনিশ্চয়তা কাজ করলেও সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন অসাধারণ। শুরুটাকে আশাপ্রদ বলতেই হচ্ছে।’ বিশ্বকাপ শুরুর কদিন আগে নেইমারের উপর থেকে চাপ কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন পেলে। কিন্তু প্রথম ম্যাচ দিয়ে সেই পেলের সাথেই তুলনা শুরু হওয়ায় চাপটা বেড়ে গেল আরও কয়েকগুণ। নেইমার কি পারবেন বাকিটা সময় প্রত্যাশার চাপ মেটাতে?