কুসংস্কারের অন্ধকারে তিস্তা ব্রহ্মপুত্র যমুনার চরাঞ্চল
তাজুল ইসলাম রেজা, গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৪, ২২:৪০
যমুনা, বহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে রয়েছে গাইবান্ধার সাঘাটা, ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৪ টি ইউনিয়ন। শুধু যোগাযোগ নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ চরাঞ্চলবাসীর জীবিকা উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠান গত ৪২ বছরে কোটি কোটি টাকা খরচ করে কতটুকু উন্নয়ন করেছে তা আজ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১২ বছর পার হওয়ার আগেই চরের প্রতিটি কন্যা শিশুকে এখনও কনের সাজে সাজতে হয়। কনে সাজার কঠিন বাস্তবতাই শুধু নয়, ভূত, পেত্নি, মাসাম (জলের ভূত), কালি (সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবতা) সহ বিভিন্ন ভয়ংকর সব গল্প পুঁজি করে ওঝা, ফকির ও কবিরাজদের জমজমাট ব্যবসার ফাঁদে পড়ে এখনও প্রতিদিন শিশু কিংবা কিশোর বয়সেই কত মানুষের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। তার হিসাব কি তাদের (সরকার ও বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠান) কাছে আছে?
ভূত-পেত্নি আছর করলেই মানুষ কেবল অসুস্থ হয়। তখন সেই অসুস্থ মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয় ওঝা, ফকির কিংবা কবিরাজদের কাছে। তাদের ঝাড় ফুঁক ও তাবিজ কবজের গুণেই তারা সুস্থ হয়। চরের মানুষ এটাই বিশ্বাস করেন।
আর এমন এক কুসংস্কারের শিকার গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এড়েন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব আলগার চরের এক কিশোর মোহাম্মদ আলী। গত চার বছর থেকে বাড়ির আঙ্গিনায় গলায় দড়ি দিয়ে তাকে পশুর মত করে বেঁধে রাখা হয়েছে। কি নির্মম দৃশ্য। যা কখনও চোখে পড়েনি ওই এলাকায় কর্মরত সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা কোন এনজিও কর্মীর।
মোহাম্মদ আলীর মা শান্তি বেগম নিজের ভাষায় বলেন, ‘গেদার (মোহাম্মদ আলীর) বয়োস যহন দুই তহন হ্যার হ্রায় হ্রায় (প্রায়-প্রায়) হাড় কাইপ্যা কাইপ্যা (কাঁপুনি দিয়া) জ্বর আহে (আসে)। গেদারে নিয়্যা কবিরাজের কাছে যাই। কবিরাজ হন (বলেন) তারে নাকি কালি আছর করেছে। তারা অনেক ঝাড় ফুঁক করেছে। তাবিজ দিয়াছে। ওঝা, ফকির ও কবিরাজ ম্যালা বদল করেছি। কিন্তু গেদা আর (আমার) দিন দিন আরো কাহিল হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘কোন ওঝা, ফকির ও কবিরাজ হেই কালিরে ছারাইবার পারে নাই। কালি আছর করলে এহনও টালমাইরা (চক্কর দিয়ে) ফালাইয়া দ্যায়। তাই ছাগলের দড়ি গলায় দিয়া বাইনধ্যা রাখছি।’
এলাকাবাসী ও পরিবারের বিশ্বাস অনুযায়ী দীর্ঘদিনের চিকিত্সায় কালি ছাড়াতে ব্যর্থ হওয়ায়, গত চার বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে শিশুটি। ততদিনে একাধিক ওঝা, ফকির ও কবিরাজের চিকিত্সায় সর্বস্বান্ত হয়েছে শিশুটির পরিবার। মানসিক ভারসাম্য হারানোর পর থেকে এভাবে বাড়ির উঠোনে বেঁধে রাখা হয় তাকে।
স্থানীয় এনজিও কর্মী বিজয় কুমার বলেন, চরাঞ্চলের মানুষের অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার ও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। ওইসব এলাকায় মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। তিনি আরো জানান, টাইফয়েড রোগের সঠিক চিকিত্সা না করায় ছেলেটি ক্রমান্বয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে। মোহাম্মদ আলীর পিতা খোকা মিয়া জানান, খুঁড়িয়ে হাঁটতে গিয়ে আগুনে পড়ে বামহাতটি পুড়ে বাঁকা হয়ে যায়। বন্দী অবস্থা থেকে একটু সময়ের জন্য ছাড়া পেলেই ছুটতে থাকে সে। এতে করে তাকে পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। তাই ওকে সার্বক্ষণিক বেঁধে রাখা হয়। অভাব-অনটনের সংসারে ৪ জনের মুখের অন্ন জোগাতেই তিনি যেখানে হিমশিম খান, সেখানে প্রতিবন্ধী মোহাম্মদ আলীর চিকিত্সা করাবেন কি দিয়ে?
সাংবাদিকদের কাছে এমন খবর শোনার পর টনক নড়ে স্বাস্থ্য বিভাগের। দীর্ঘ চার বছর পর অবশেষে শনিবার দুপুরে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এড়েন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের আলগার চর থেকে তাকে উদ্ধার করে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তির পর জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিত্সক ডাক্তার মো: রফিকুজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিন গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখায় তার মানসিক অবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সার মাধ্যমে তাকে সারিয়ে তোলা সম্ভব। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. আহাদ আলী জানান, ওই এলাকায় কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।