নদীতে লাশ ডোবানোর পর র্যাবকে ধন্যবাদ জানান নূর
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৪, ২২:৪২
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডার মামলার প্রধান আসামি কাউন্সিলর নূর হোসেনের প্রধান বডিগার্ড মোর্তুজা জামান চার্চিল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। চাঞ্চল্যকর এই জবানবন্দিতে চার্চিল বলেছেন, নূর হোসেনের প্রতিনিধি হিসাবে লাশ ডোবানোর ঘটনায় র্যাবের সঙ্গে তিনি ছিলেন। লাশ নদীতে ডোবানোর পর নূর হোসেন ফোন করে র্যাব কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। শনিবার নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে এই জবানবন্দি দেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ নিয়ে এই ঘটনায় র্যাবের সাবেক দুই কর্মকর্তাসহ তিন জন আদালতে স্বীকারোক্তি দিলেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান সাংবাদিকদের জানান, চার্চিল ছিল নূর হোসেনের বডিগার্ড। সে পুরো বিষয়টা জানে। নূর হোসেনের অপকর্মের সাক্ষী সে। আদালতে সে সেভেন মার্ডার নিয়ে কোথায় কখন সভা হয়েছে সে ব্যাপারে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে। আদালতের একটি সূত্র জানায়, আদালতে চার্চিল দীর্ঘ জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করলেও সে দাবি করেছে নূর হোসেনের নির্দেশ পালন করতে গিয়েই এই ঘটনায় জড়িয়েছে।
চার্চিল আদালতে বলেছে, মূলত নূর হোসেন র্যাবের সঙ্গে বৈঠক করেই প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার অপহরণের ঘটনাটি দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয়েছে। নূর হোসেনের বডিগার্ড হিসাবে কর্মরত থাকায় তার সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতো চার্চিল। হোসেনের অনেক অপকর্মের সাক্ষী এই চার্চিল। নূর হোসেনের সঙ্গে থাকায় র্যাবের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হতো চার্চিলের। বিভিন্ন সময়ে উপঢৌকন পাঠানোসহ টাকার লেনদেন হতো চার্চিলের মাধ্যমে।
আদালতে চার্চিল আরো বলেন, ২৭ এপ্রিল দুপুরে নজরুল ইসলামসহ ৭ জনকে অপহরণের পর রাত ৯টার পরে নূর হোসেন চার্চিলকে ফোন করে। তখন নূর হোসেনের নির্দেশে চার্চিল কাঁচপুর ব্রিজের পশ্চিম পাড়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরভূমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বালু-পাথর ব্যবসাস্থলে থাকা লোকজনদের সরিয়ে দেয়। রাত ১০টার দিকে এখানে গাড়িতে করে ৭ জনকে আনা হয়। তখন র্যাবের তারেক সাঈদ, মেজর আরিফ ও এম এম রানা সহ র্যাবের লোকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তখন গাড়ি থেকে মৃত অবস্থায় সাতজনকে নামানো হয়। পরে লাশ উঠানো হয় একটি ইঞ্জিন চালিত ট্রলারে। লাশ পরে তিন নদীর মোহনাতে ফেলে দেয়া পর্যন্ত র্যাবের সঙ্গেই ছিলেন চার্চিল।
চার্চিল জানান, লাশ ডোবানোর সময় বেশ বিচলিত থাকা নূর হোসেন বার বার তার সঙ্গে কথা বলে সর্বশেষ আপডেট নিতে থাকেন। এর মধ্যে কয়েকবার নূর হোসেনের সঙ্গে কথা হয় আরিফের। লাশ ফেলার পর নূর হোসেনকে ফোন করে আরিফ বিষয়টি জানায়। লাশ ফেলে দেয়ার পর সবশেষ তথ্যটি যখন নূর হোসেনকে জানানো হয় তখনই মূলত নূর হোসেন কিছুটা শান্ত হন। তিনি র্যাবের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। চার্চিল আরো জানান, নূর হোসেনের পরিকল্পনাতেই মূলত র্যাব সাতজনকে অপহরণের পর লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। আমি শুধু শীতলক্ষ্যা সেতুর নিচে লাশ গাড়ি থেকে নামানো ও পরে ট্রলারে করে নদীতে ফেলা পর্যন্ত অবলোকন করে বিষয়টি হোসেনকে জানিয়েছি। এর বেশি আমার কোন কাজ ছিল না। সাত হত্যাকাণ্ডের পর অভিযোগের তীর যখন নূর হোসেনের দিকে উঠতে থাকে তখনই চার্চিল নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যায়। এর আগে গত ৬ জুন সকালে ফরিদপুরের নর্থচ্যানেল ইউনিয়নের সালামখার ডাঙ্গী এলাকা থেকে চার্চিলকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। চার্চিল ফরিদপুর শহরতলীর ভাটিলক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত মশিউর রহমানের ছেলে।
র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ ফের রিমান্ডে
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত র্যাব-১১ এর সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদকে ৫ দফায় ২৮ দিনের রিমান্ড শেষে ৬ষ্ঠ দফায় আরো ৪ দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দিয়েছে আদালত।
অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও তার গাড়ি চালক ইব্রাহিমকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ৫ দিনের রিমান্ড চেয়ে তারেক সাঈদকে শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কে এম মহিউদ্দিনের আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। ইতিমধ্যে তারেক সাঈদের সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ায় আরিফ হোসেন ও এম এম রানা ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। তারা জবানবন্দীতে সাত খুনের ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
বিকালে কঠোর নিরাপত্তায় তারেক সাঈদকে আদালতে আনা হয়। শুনানির সময়ে আদালতে পুলিশের এসআই আশরাফুজ্জামান বলেন, নূর হোসেনের টাকায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে র্যাব। ইতিমধ্যে আরিফ হোসেন ও এম এম রানা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। তাদের দেওয়া তথ্য আরো যাচাই বাছাই করতে ৫ দিন করে রিমান্ড প্রয়োজন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় র্যাবের সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
রিমান্ড শুনানির সময়ে রাষ্ট্রপক্ষে পুলিশ ও আইনজীবীরা বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।