খালেদাকে রিমান্ডে নিলে জিয়ার খুনিদের কথা জানা যাবে
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৪, ২২:৪৪
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কার কতটুকু সম্পৃক্ততা ছিল বা হত্যাকারী কারা তা জানতে রিমান্ডে নিতে হলে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও বড় ছেলে তারেক রহমানকে নিতে হবে। লন্ডন থেকে উন্নত চিকিত্সার নামে মালয়েশিয়া এসে তারেক রহমান এক অনুষ্ঠানে জিয়া হত্যার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীকে রিমান্ডে নেয়ার দাবি জানানোর বিষয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলে জবাবে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, জিয়া হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৯ বছর পর নব্বইয়ের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় এক সমাবেশে খালেদা জিয়া প্রথম বলেছিলেন, জেনারেল এরশাদ তার স্বামী হত্যাকারী। এখন প্রশ্ন হলো, যাকে তিনি (খালেদা) স্বামী হত্যাকারী হিসেবে আখ্যায়িত করলেন সেই স্বামী হত্যাকারীর কাছ থেকে দুটি আলিশান বাড়ি, গাড়ি এবং নগদ অর্থ নিলেন কিভাবে? স্বামী হত্যাকারীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিতে তার লজ্জা করলো না? সুতরাং মা-ছেলেকে রিমান্ডে নিলেই জিয়ার আসল হত্যাকারী কারা তা জানা যাবে।
গতকাল শনিবার বিকালে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অর্জিত সাফল্যের বিস্তারিত জানাতে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় তিনি চীন সফর ছাড়াও দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, স্বামীর লাশ খালেদা জিয়া দেখতে চাননি কেন? আর যে ছেলে এখন বড় কথা বলছে সে কী বাপের মুখ দেখতে চেয়েছে? তখন তো তার বয়স একেবার কম ছিল না। তাহলে রহস্য কী? ওটা গুলি খাওয়া লাশ ছিল। দেখলে কী সমস্যা ছিল? এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, জিয়া হত্যা মামলা বর্তমানে চট্টগ্রাম কোর্টে বিচারাধীন। মামলাটি দেড়শ’ বার কোর্টে উঠেছে। কিন্তু বিএনপির কেউ কি এই মামলার কোন সাক্ষী দিয়েছে? বিএনপির কেউ কি মামলাটি চালাচ্ছে? বরং ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়ে মামলাটি স্থগিত করে। ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোট ডাকাতির নির্বাচনের পর দেড় মাসসহ তিনবার খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার ছেলে হাওয়া ভবন খুলে সমান্তরাল সরকার পরিচালনার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা অপকর্ম করেছে। জিয়া হত্যার বিচার কেন বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে করলো না? প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, জিয়া হত্যা মামলা এখনো আদালতে আছে। খুনের মামলা কখনো তামাদি হয় না। জিয়াকে হত্যার পর বিদ্রোহের অভিযোগে তড়িঘড়ি করে বিচারের নামে ১২ জন সামরিক অফিসারকে ফাঁসি দেয়া হয়। ফাঁসি হওয়া অনেক অফিসারই জানতো না তাদের কী অপরাধ ছিল? কিন্তু এত তড়িঘড়ি করে মামলাটির বিচার করা হলো কেন? কেন প্রধানমন্ত্রীর পদে থেকেও স্বামী হত্যার বিচার করলেন না, জিয়া হত্যাকারীদের সঙ্গে তার (খালেদা) কী সম্পর্ক ছিল, জাতির কাছে একদিন তাকে এর জবাব দিতেই হবে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, জেনারেল জিয়া মারা যাওয়ার পর তিনি নাকি শুধুু ভাঙ্গা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গেছেন। তখন ক্যাবিনেট সিদ্ধান্ত নিল মানবিক দিক বিবেচনা করে খালেদা জিয়াকে একটা বাড়ি দেয়া হবে। কিন্তু ক্যাবিনেট যে বাড়িটি দিতে চাইলো সেটি তার পছন্দ হলো না। এরপর গুলশানে সবচেয়ে দামি ও ভাল বাড়িটি নিয়েছেন তিনি। তাতেও উনি ক্ষান্ত হলেন না। এরশাদের কাছ থেকে ক্যান্টেনমেন্টের বাড়িটিও নিলেন। গাড়িসহ আরো অনেক আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন। এখন প্রশ্ন হলো, এরশাদকে উনি স্বামীর হত্যাকারী বললেন, তার কাছ থেকে গাড়ি-বাড়ি নিলেন কিভাবে?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে সরকারের সাথে খালেদা জিয়া সংলাপের যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সে ব্যাপারে অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংলাপ করবো কার সঙ্গে? আন্দোলনের নামে যারা শত শত মানুষ হত্যা করেছে, তারা কী সেই প্রাণ আর ফেরত দিতে পারবে? খালেদা জিয়া সংলাপ চান আর তার ছেলে চান আমার রিমান্ড। এখন মা-ছেলেকেই ঠিক করতে হবে তারা কী চায়। আগে তারা তাদের করণীয় ঠিক করুক, পরে দেখা যাবে। দেশের স্বার্থে যা করার আমরা তাই করবো। তাছাড়া আমি নিজে টেলিফোনে সংলাপ করতে গিয়ে ৫ জানুয়ারির আগে তার (খালেদা) কাছ থেকে যে ঝাড়ি খেলাম, সেই সুমধুর বচন কী আবার শুনবো? তিনি বলেন, নির্বাচনে না এসে উনি (খালেদা) যে ভুল করেছেন তা শুধরানোর জন্য এখন অনেক কথাই বলছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন তা পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খুনি-বেঈমান-মোনাফেক মুশতাক সংবিধান লংঘনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমানকে সেনা প্রধান বানিয়েছিল। খুনি মুশতাকের সঙ্গে জেনারেল জিয়ার কী সম্পর্ক ও নেপথ্যে কী সমঝোতা ছিল? বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের জিয়া শুধু লালন-পালনই নয়, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করেছিলেন। খালেদা জিয়ার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বামীর হত্যাকারীর কাছ থেকে আপনি কিভাবে সুযোগ-সুবিধা নিলেন? আমি তো কিছুই নেইনি। বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আমার তো কিছুই ছিল না। দেশে ফেরার পর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে আমাকে ঢুকতে দেননি জিয়াউর রহমান। এ সময় আবেগ-আপ্লুত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, বাড়িতে গিয়ে বাবা-মার জন্য একটু মিলাদও করতে পারিনি। বাড়ির সামনের রাস্তায় বসে অসংখ্যবার মিলাদ দিয়েছি। তখন তো আমাকেও অনেক সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমি তা নেইনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেনারেল জিয়া সস্ত্রীক ভারত সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে জিয়া আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, আমি দেখা করিনি। ১৯৮০ সালে লন্ডন সফরের সময়ও জিয়াউর রহমান আমার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আমি দেখা করিনি। কারণ, কোন খুনির মুখ আমি দেখতে চাইনি।
ভারতের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাংলাদেশে আসন্ন সফরকালে কোন্ বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা শুভেচ্ছা সফর। নতুন সরকারের শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে তিনি এ সফরে আসছেন।
‘চীন না জাপান কোন্ দেশকে গভীর সমূদ্রবন্দর নির্মাণ করতে দেওয়া হবে’- এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ বিষয়ে বেশ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। এসব প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। যে দেশ খুব দ্রুত কাজ করতে পারবে, সেই দেশকেই গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে দেয়া হবে। রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অদ্ভুত চিন্তার কিছু লোক আছে আমাদের দেশে। না জেনে এবং সেখানে না গিয়েই তারা আন্দোলন করছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণাঞ্চল অবহেলিত ছিল। আমি দক্ষিণের মেয়ে। ওই অঞ্চলের প্রতি আমার দায়িত্ব আছে।’ তিনি বলেন, দক্ষিণের মানুষেরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয় বলে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাঁকে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে। এখন আমরা নিজেদের টাকায় এই সেতু নির্মাণ করছি।’
জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গটি একজন সাংবাদিক তুললে জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনি নির্বাচনের প্রশ্ন উঠছে কেন? নির্বাচন প্রসঙ্গে ড. কামাল হোসেনকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সত্তরের নির্বাচনে তিনিও বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, উনি সংবিধান তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সেই সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হচ্ছে। তিনি বলেন, কিছু মানুষ আছে যাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ভাল লাগে না।