‘আমরাও মানুষ, আমাদের পুড়িয়ে মারা হবে?’

‘চোখের সামনে সবার অঙ্গার হয়ে যাওয়া লাশ। কয়টা লাশ ঘাড়ে নিব। আমরাও তো মানুষ। তাই বলে তালা দিয়ে মারতে হবে।’ মালকোচা মারা লুঙ্গি পড়া ৫৫ বছরের ইয়াছিন বিহারী ক্যাম্পের মধ্যে চিত্কার করছেন আর একথা বলছেন। ঘটনার কী বর্ণনা দিবেন-তার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন ইয়াছিন। সকাল থেকে কাঁদতে কাঁদতে দুপুরের দিকে তার চোখ থেকে আর পানি ঝরছে না।ক্যাম্প অফিসের পাশে একটি বেঞ্চে বসে থাকেন। অফিসের ভিতর তার অতি আপন পরিবারের ৯ জনের লাশ রাখা। সবার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন তিনি। ইয়াছিনের পরিবারের যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন স্ত্রী বেবী আক্তার, তিন মেয়ে শাহানি, আফসানা, রুখসানা, ছেলে আশিক, যজম ছেলে লালু ও ভুলু, পুত্রবধূ শিখা ও শাহানির ছেলে মারুফ। নিহত শাহানির মামাতো বোন শাবানা বলেন, ইয়াছিন গুলশানে একটি সেলুন দোকানের কর্মী। শবে বরাত উপলক্ষে শাহানি তার ৩ বছরের ছেলে মারুফকে নিয়ে ঐ বাসায় এসেছিল। শবে বরাতে হালুয়া, ফিরনি ও পায়েস রান্না করা হয়েছিল। রাতে সবাই খেয়ে এক সাথে ঘুমিয়ে পড়ে। ঐ সময় ইয়াছিন মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন। ক্যাম্পে হামলার খবর পেয়ে তিনি মসজিদ থেকে ছুটে আসেন। তখনও তিনি বুঝতে পারেননি যে এই আগুন তারই পরিবারকে নিবংশ করবে। কালশী রোডের দিক থেকে পুলিশ ও স্থানীয় জনতা হামলা চালানোর সময় ইয়াছিন পুরাতন রোডে অবস্থান করছিলেন। পুলিশের গুলি ও টিয়ার সেলের মুখে তিনি ঘরের কাছেও যেতে পারছেন না। তার ঘরটি ৫ নম্বর রোডের আই লাইনে। আগুনের লেলিহান শিখা ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের করার কিছুই ছিল না। কিছু সময় পর খবর পান যে আগুনে তার পরিবারের কেউ কেউ মারা গেছে। ইয়াছিনের বিশ্বাস হচ্ছিল না। এরই মধ্যে ক্যাম্পবাসীদের কয়েকজন তাকে জোর করে নিয়ে যায় অফিসের কাছে। একজন তাকে জানায় যে, তার সবাই মারা গেছে। অফিসের ভিতরে ঢুকে দেখেন ৯ টি পোড়া লাশ পড়ে আছে। এক লাশের হাতের চুরি দেখে বুঝতে পারেন যে এটা তার স্ত্রী বেবী আক্তারের লাশ। যজম বাচ্চা লালু ও ভুলু মারা যাওয়ার আগে হয়তো বাঁচার জন্য বাবাকে কাছে চেয়েছিল। তিন বছরের নাতি মারুফের দিকে তিনি তাকাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘ছোট্ট মাসুম বাচ্চাটি কী আতশবাজি ফুটিয়েছিল? তাহলে তার পরিবারের স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের কেন হত্যা করা হলো?’ নিহত শাহানির স্বামী শওকত হোসেন বলেন, তিনি একটি বেনারসী কারখানার কর্মচারী। পল্লবীর কালশীতে সপরিবারে থাকেন। শবে বরাত উপলক্ষে স্ত্রী ও সন্তানকে তিনি শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ভোরে ঘটনা শোনার পর তিনি কালশীর বিহারী ক্যাম্পে ছুটে আসেন। কিন্তু তার আগেই সব শেষ।