রাজতন্ত্রে ক্লান্ত স্পেন!
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৪, ২২:০১
বৈশ্বিক মহামন্দায় স্পেন পর্যুদস্ত। নাকাল অবস্থা তাদের অর্থনীতির। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে স্পেনে বেকারত্বের হার সবচে’ বেশি। একটা পর্যায়ে এ হার ৩০ শতাংশে পৌঁছেছিল। বেইল-আউট ফান্ড গঠন সত্ত্বেও উত্তরণের লক্ষণ নেই। এ অবস্থায় অনেকে দুষছে সেদেশের রাজতন্ত্রকে। কিন্তু সেটি অবসানের সম্ভাবনা আপাতত নেই। উপরন্তু রাজা জুয়ান কার্লোস ওয়ান পুত্রের হাতে ‘সিংহাসন’ ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে আমজনতার উল্লেখযোগ্য একটা অংশকে খুব একটা খুশি মনে হচ্ছে না। ঘোষণা শোনার পরই মাদ্রিদসহ বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে এসেছিল অসংখ্য লোক; হাতে ছিল প্ল্যাাকার্ড। রাজতন্ত্রের সরাসরি অবসান না চাইলেও দাবি জানিয়েছে, এটি থাকবে কি থাকবে না এ ব্যাপারে গণভোট আয়োজনের। তবে স্পেনের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় বিশ্বাস, এমন হলেও চিন্তার কোনো কারণ নেই। কারণ, বেশিরভাগ লোক রাজতন্ত্র বহাল রাখার পক্ষেই রায় দেবে।
সম্প্রতি এল পেরিস পত্রিকা পরিচালিত একটি জরিপে বেরিয়ে এসেছে, স্পেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬২%) লোক মনে করে, রাজতন্ত্র থাকা না থাকার বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে গণভোটের আয়োজন করা উচিত। আরো দেখা গেছে, এ মুহূর্তে গণভোট হলে ৪৯ শতাংশ লোক রাজতন্ত্র অব্যাহত রাখার পক্ষে ভোট দেবেন আর ৩৬ শতাংশ সমর্থন করবেন প্রজাতন্ত্রকে। কাজেই সহসা রাজতন্ত্র পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনাই নেই। তারপরেও এর অবসান দাবি করে অনেকে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
৭৬ বছর বয়স্ক বর্তমান রাজা ৪৩ বছর বয়সী পুত্র ফেলিপের কাছে দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে অবসরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান, চলতি মাসের ২ তারিখে। সে অনুযায়ী যুবরাজ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হবেন আসছে ১৯ জুন। সংসদের যৌথ অধিবেশনে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল উভয়ই এ বিষয়টিকে ব্যাপক সমর্থন জানায়। কিন্তু গত তিন বছরে রাজপরিবারের সদস্যদের কয়েকটি কেলেংকারি রাজতন্ত্রের জনপ্রিয়তায় ভাটা ধরিয়েছে। অথচ বছর তিনেক আগে অনুষ্ঠিত একাধিক জরিপে দেখা গিয়েছিল সিংহভাগ লোকই চায়, স্পেনে রাজতন্ত্র টিকে থাকুক। জুয়ান কার্লোস ওয়ানকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই দেখতে চান, এমন লোকের সংখ্যা কোনোটিতেই ৭৫ শতাংশের কম ছিল না, জেনারেল ফ্রাংকোর মৃত্যুর পর রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার হওয়ায় রাজা হিসেবে ১৯৭৫ সালে অভিষেক হয়েছিল তার।
সাম্প্রতিক মিটিং-মিছিল একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, স্পেনের লোকজনের মধ্যে প্রজাতন্ত্রের প্রতি দুর্বলতা ক্রমশই বাড়ছে। কিন্তু যারা রাজনীতির কলকাঠি নাড়েন, তারা এ বিষয়টিকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী মারিয়ানো রাজয় রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখা না রাখার বিষয়ে গণভোটের দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে পরিহাসের সুরে উল্টো যুক্তি দেখিয়েছেন, স্পেনের ১৯৭৮ সালের সংবিধান রাজাকে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং এটি ওই সময়ে আয়োজিত গণভোটে ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়েছিল। কাজেই ফের গণভোটের কোনো প্রয়োজন নেই। রাজা দেখতে না চাওয়া লোকের সংখ্যা যে ক্রমশই বাড়ছে, তা প্রধানমন্ত্রী মানতে নারাজ। তার মতে, জরিপে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটছে না; এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে এক-দুই হাজার লোকের উপর জরিপ চালিয়ে কোনো মন্তব্য করাটা মোটেও ঠিক না আর একটি চক্র স্পেনের রাজতন্ত্রকে বিতর্কিত করতে বরাবরই তত্পর।
মূলত কয়েকটি বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন রাজতন্ত্রের প্রশ্নে গণভোটের দাবিতে সোচ্চার। এগুলোর নেতারা সাধারণ জনগণকেও তাদের সঙ্গে রাস্তায় নামার আহবান জানিয়েছেন। মিছিলে তাদের শ্লোগানের ভাষাটা থাকে এরকম, ‘স্পেন, আগামী দিনে হবে প্রজাতান্ত্রিক।’ প্রতিবাদকারীরা স্পেনের বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও বেকারত্বের কারণে খুবই হতাশ। এদের একজন বলছিলেন, ‘আমরা চাই না তারা আমাদের শিশু ভাবুক, যা এখন ভাবছে। আমরা যা চাই তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমরা রাজা দেখতে চাই না। দেশের প্রধান হিসেবে কাউকে বেছে নিতে চাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। এটি হলে স্পেনের অনেক সমস্যাই দূর হয়ে যাবে।’
বিরোধীদের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে ইদানীং রাজতন্ত্রের সমর্থকরাও র্যালি করতে শুরু করেছে। তাদের যুক্তি, রাজা স্পেনকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন। এ কাজ একজন প্রেসিডেন্ট কখনোই করতে পারবেন না। তার একটি দল থাকবে এবং সেই দলের প্রতি তার দুর্বলতা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। কাজেই তিনি নিরপেক্ষতার পরিচয় দিতে পারবেন না, যা কি-না স্পেনের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
বামপন্থী নেতা পাবলো ইগলেসিয়াস তাদের আন্দোলন সম্পর্কে বলছিলেন, ‘আমরা দেশের প্রধান হিসেবে একজনকে বাছাই করতে চাই আর এ অধিকার আমাদের থাকা উচিত। আজকের যুগে রাজা বা রাণী থাকাটা হাস্যকর ব্যাপার। তবে এখন পর্যন্ত পিপলস পার্টি ও সোশালিস্ট পার্টি রাজতন্ত্রকে সমর্থন দিচ্ছে। তারা ভাবছে রাজার প্রতি জনগণের আস্থা রয়েছে। তবে গণভোট দিতে এত ভয় কীসের?’