পাক-ভারত স্থায়ী শান্তি সম্ভব?
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০১৪, ২২:০১
কংগ্রেস সরকারের আমলে মুম্বাই হামলার ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। এক প্রকার মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দুই দেশের সরকারপ্রধানদের। আন্তর্জাতিক একাধিক সম্মেলনে মনমোহন সিং এবং নওয়াজ শরিফ উভয়ে অংশ নিলেও সৌজন্য সাক্ষাত্টুকুও করেননি তারা। দিল্লি ও ইসলামাবাদের মধ্যে চলছিল কঠোর বাক্যবাণ চালাচালি। ভারত তার মাটিতে জঙ্গিবাদ বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ এনে থাকে পাকিস্তানি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু পাকিস্তান এই দাবি মানতে রাজি ছিল না। বিরোধ মূলত এটা নিয়েই।
ধারণা করা হচ্ছিল ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার যদি দিল্লির মসনদে বসে তবে পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক হবে একেবারে সাপে নেউলের মতো। সারাক্ষণ যুদ্ধমুখর পরিস্থিতি বিরাজ করবে দুই দেশের মাঝে। এর কারণ, নির্বাচনের আগে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীসহ দলের শীর্ষনেতারা নির্বাচনী প্রচারের সবচে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন পাকিস্তান বিরোধিতা। তারা ক্ষমতায় গেলে পাকিস্তানকে ‘দৌড়ের উপর’ রাখবে এমন কথাও বলেছিলেন বিজেপি নেতারা। কিন্তু বিজেপি বড় ব্যবধানে ভোটে জেতার পর দেখা গেল উল্টো চিত্র। নরেন্দ্র মোদী তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে সার্ক দেশের নেতাদের আমন্ত্রণ জানালেন। বাদ গেলেন না পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফও। শরিফ ভারতে এসে মোদীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকও করলেন। দেখা গেল, বিজেপির বিজয়ে পাক-ভারত বৈরিতা বাড়ার পরিবর্তে কমে যাবার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। পাক প্রধানমন্ত্রীকে মোদী অনুরোধ করলেন পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিরা যেন ভারতবিরোধী তত্পরতা না চালাতে পারে সেদিকে নজর রাখতে। নওয়াজ সেই প্রতিশ্রুতিও দেন মোদীকে। দেশে ফিরে গিয়েও নওয়াজ-মোদীর যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। একে অন্যের ও তাদের পরিবারের জন্য পাঠান একাধিক উপহার। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে ফের গরম কড়াইয়ের উত্তাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যখন তখন সীমান্তে গুলি চালানোর অভিযোগ তুলছে ভারত।
ভারত সফরের পর নওয়াজ শরিফকে শাল উপহার দিয়েছিলেন মোদী। অপরদিকে মোদীর মায়ের জন্য শাড়ি পাঠিয়েছিলেন নওয়াজ। একদিকে শাড়ি-শালের সৌজন্য, অন্যদিকে সীমান্তে গোলাগুলির আওয়াজ। শুক্রবার সারাদিন ভারত-পাক সম্পর্ক চলল এই দুয়ের ভারসাম্যে। কয়েকদিন আগে পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের লেখা চিঠির জবাব শুক্রবার দিয়েছেন মোদী। শরিফকে ‘প্রিয় মিয়াঁ সাহেব’ সম্বোধন করে তিনি লেখেন, ‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে আপনার মতামত আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমি চাই, রক্তপাত ও সংঘাতমুক্ত পরিবেশে আপনার ও আমার সরকার ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পথে নিয়ে যাক।’
মোদী যখন এই চিঠি লিখছেন তার কয়েক ঘণ্টা আগে সকাল সাতটা থেকেই জম্মু ও কাশ্মীরের মেন্ধার সেক্টরে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর অস্ত্রবিরতি ভঙ্গ করে গোলাগুলি চালাতে শুরু করেছে পাক সেনাবাহিনী। ভারতীয় সীমান্তে তারা রকেট ও মর্টার ফেলে। কয়েকটি গোলা অসামরিক এলাকাতেও পড়ে। ভারতীয় সেনারাও তার জবাব দেয়। শনিবারই জম্মু-কাশ্মীরে সফর করেন ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী অরুণ জেটলি। তার সফরের প্রাক্কালেই এই আক্রমণ। পরে সেনাপ্রধান বিক্রম সিংয়ের সঙ্গে দুই ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেন মোদী। সেই বৈঠকের প্রধান আলোচ্য বিষয়ই ছিল পাকিস্তান ও চিন সীমান্ত বরাবর নিরাপত্তা। জেটলি পাকিস্তানের উদ্দেশে শনিবার বলেন, গুলি চললে ভারত কিন্তু চুপ করে থাকবে না।
মোদী ও শরিফ যখন দুই দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে এতটাই আগ্রহ দেখিয়েছেন, পরস্পরের মায়ের জন্য উপহারের পর সৌজন্যমূলক চিঠিতেও কূটনীতি জারি রেখেছেন, তখন পাক সেনার তরফ থেকে এই ধরনের আক্রমণ খুব একটা ভাল সঙ্কেত দিচ্ছে না। অতীতে নওয়াজ শরিফের আমলেই দিল্লি-লাহোর বাস চালু হয়েছিল, অটলবিহারী বাজপেয়ী পাকিস্তান গিয়েছিলেন। আর সেই সৌহার্দ্যের রেশ না মিটতেই পাক সেনা কার্গিলে ঢুকে পড়েছিল। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বরাবরই বলা হয়, সেখানে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র আছে। নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তার একটি হলে পাক সেনাবাহিনী ও আইএসআই-এর জোটও কিছু কম ক্ষমতাবান নয়। ফলে শরিফ বন্ধুত্ব চাইলেও সেনা ও আইএসআই-এর মনোভাব কী হবে, তারা সংযত থাকবে কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শরিফ শান্তি স্থাপনে উদ্যোগী হওয়ার পর সেনাবাহিনীর এই গুলি চালনা আশঙ্কাটা বাড়িয়ে দিচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা টুইট করে বলেছেন, ‘রাজৌরি ও পুঞ্চ সেক্টরে অস্ত্রসম্বরণের চুক্তি ভেঙে প্রচুর গোলাগুলি চালিয়েছে পাক সেনারা। কিছু গোলা তো অসামরিক এলাকায় পড়েছে। বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ওমর তাও রেখেঢেকে সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস তো আরও স্পষ্টভাবে মোদী সরকার ও বিজেপির মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক শাকিল আহমেদ বলেছেন, ‘ইউপিএ আমলে এই ঘটনা ঘটার পর মোদী বলেছিলেন, সমস্যা সীমান্তে নয়, দিল্লিতে বসে থাকা লোকের চিন্তায়। এবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি কী বলবেন?’ সাবেক মন্ত্রী ও কংগ্রেসের রাজ্যসভা এমপি রাজীব শুক্লার মন্তব্য, ইউপিএর সময় অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেই বিজেপি প্রবল হইচই শুরু করে দিত। এখন তারা চুপ কেন? মোদী বা বিজেপির তরফে সরাসরি কিছু বলা হয়নি অবশ্য। তবে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পূর্বশর্তই হল সীমান্ত স্বাভাবিক থাকা। পাশাপাশি সম্ভবত বিরোধীদের এই সমালোচনার একটা উত্তর হিসেবেই বলেছেন, ‘ভারত প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। মোদী চিঠির শেষে লিখেছেন, ‘আমার মাকে শাড়ি পাঠানোর জন্য আপনাকে আবার ধন্যবাদ জানাই। আপনার এই সৌজন্যের খুবই প্রশংসা করেছেন মা।’
কিন্তু সীমান্তে গুলি চলায় এখন দিল্লিতে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, শাড়ি-শালের আদান-প্রদানে গুলির শব্দ তাল কাটবে কি!