জিততে পারে যে কেউ

শুরুতেই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দল মুখোমুখি হওয়াতে বিশ্বকাপের চলতি আসরটা আগুন ঝরাতে শুরু করেছে প্রথম থেকেই। ব্যতিক্রম হচ্ছে না আজও। জি গ্রুপের প্রথম ম্যাচে আজ মাঠে নামছে জার্মানি এবং পর্তুগাল। যে ম্যাচে নিশ্চিতভাবেই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তর্কযোগ্যভাবে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়টি জার্মানির রক্ষণে চিড় ধরাতে পারেন কিনা তার উপরেই মূলত নির্ভর করছে পর্তুগালের ভাগ্য। তবে আমার মনে হয়, ফুটবল ঐতিহ্য বা তারকাখ্যাতির বিচারে জার্মানি এগিয়ে থাকলেও আজকের ম্যাচে ফেভারিট নয় কেউই। দুই দলই ম্যাচে একাধিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে। আর যারা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে হাসি মুখে মাঠ ছাড়বে তারাই। এই গ্রুপের অন্য ম্যাচে আফ্রিকান পরাশক্তি ঘানা খেলবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। শক্তির বিবেচনায় দুই দলের খুব বেশি পার্থক্য না থাকলেও কন্ডিশন বিবেচনায় আমি খানিকটা এগিয়ে রাখবো ঘানাকে। ব্রাজিলের গরম আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে নেয়াটা কঠিনই হবে আমেরিকানদের জন্য। খেলাধুলার জগত্টাই এমন যে, এখানে ইতিহাসের ভূমিকা সামান্যই। কে কতবার শিরোপা জিতেছে, কার অতীত কত সমৃদ্ধ তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন নির্দিষ্ট দিনে কে ভাল খেলছে। এই কথাটা প্রযোজ্য আজকের ম্যাচের জন্যও। ফুটবল ঐতিহ্য বিবেচনায় জার্মানির ধারে কাছেও হয়তো থাকবে না পর্তুগাল। জার্মানি যেখানে বিশ্বকাপের শিরোপাই জিতেছে তিন বার, সেখানে পর্তুগালের সর্বোচ্চ সাফল্য শেষ চারে খেলা। ফ্রাঞ্চ বেকেনবাওয়ার-জার্ড মুলারদের মতো মহাতারকা শুধু জার্মানি নয়, বিশ্বফুটবলেই বিরল। তবে, আজকের ম্যাচে অতীতের সেই সাফল্য কোন ভূমিকা রাখবে না বলেই বিশ্বাস আমার। যদিও, তাদের মত বড় কোন তারকা না থাকলেও জার্মানির এই দলটির পক্ষে যে কোন কিছুই করা সম্ভব। আসলে জার্মানির খেলার ধরনটাই তাদের অন্য সবার চাইতে এগিয়ে রাখে। জার্মানির খেলাটা কখনোই নির্দিষ্ট কোন খেলোয়াড় কেন্দ্রিক নয়। সেই বেকেনবাওয়ার-মুলার কিংবা পরবর্তীতে জার্গেন ক্লিন্সম্যান-মাইকেল বালাকদের সময়েও তাদের খেলার ধরনটা এমনই ছিল। এর পাশাপাশি মাথায় রাখতে হবে শারীরিক সক্ষমতার ব্যাপারটাও। অবিশ্বাস্য শারীরিক দৃঢতা তাদের ইউরোপের যে কোন দলের চাইতে শক্তিশালী করে তুলেছে। যে কোন কন্ডিশনের সাথেই মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা আছে তাদের। জার্মানির একটা বিষয় খুব লক্ষণীয়। এই দলটা সব সময়ই নির্দিষ্ট একটা ছকে খেলতে পছন্দ করে। বেকেনবাওয়ারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রতি যুগেই এই দলে অনেকটা প্রকৃতিপ্রদত্তভাবেই কিছু অসাধারণ রাইট ব্যাক-লেফট ব্যাক চলে আসেন। এবারও যেমন আছেন ফিলিপ লাম। রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি উইং থেকে আক্রমণ চালনাতেও দক্ষ বায়ার্ন মিউনিখের অধিনায়ক। আর মাঠে তার সামনে থাকা খেলোয়াড়গুলোর দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন না! বাস্তিয়ান শোয়েনস্টেইগার, মেসুত ওজিল, স্যামি খেদিরা! বোঝাই যাচ্ছে পর্তুগালের রক্ষণের জন্য কঠিন এক চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে। এর পাশাপাশি গোলবারের নিচেও সময়ের অন্যতম সেরা একজনকেই পাচ্ছে জার্মানরা। বায়ার্নের হয়ে দুর্দান্ত একটা মৌসুম কাটানো ম্যানুয়েল ন্যুয়ের এবার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতে প্রস্তুত। জার্মানির খেলাটা যেখানে অনেকটাই ‘টিম গেম’ সেখানে পর্তুগাল খেলবে রোনালদোকে কেন্দ্র করে। এই মাপের একজন তারকা যদি দলে থাকেন তাহলে অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। যদিও রোনালদো ছাড়াও পর্তুগালের এই দলে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন, যারা ক্লাবের হয়ে নিয়মিতই ভালো ফল দেখিয়ে আসছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ন্যানি, রিয়াল মাদ্রিদের প্যাট্রিস এভরা তাদেরই কয়েকজন। তবে শেষ পর্যন্ত আগের কথাই। তারকাদ্যুতি, শক্তিমত্তা যাই বলুন, এই ম্যাচে দুই দলেরই সুযোগ সমানে সমান। দু’দলেরই ক্ষমতা আছে সুযোগ তৈরি করার, যারা সুযোগটা কাজে লাগাতে পারবে তারাই জয় নিয়ে বেরিয়ে আসবে। এদিকে ঘানা-আমেরিকা লড়াইকে আমি বলবো সমান শক্তির দুই দলের লড়াই। তবে আফ্রিকার আবহাওয়ার সাথে ব্রাজিলের এই মৌসুমের আবহাওয়ার অনেকটা সামঞ্জস্য রয়েছে। প্রচণ্ড গরম, তার সাথে অঝর বৃষ্টি। এই কন্ডিশনই বাড়তি সুবিধা দেবে ঘানাকে। দেশটির বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের ইউরোপের শীর্ষ কিছু ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা আছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে এই অভিজ্ঞতাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে যে কোন মুহূর্তে। অন্যদিকে আমেরিকা ক্রমেই মাঝারি শক্তির একটা ফুটবল রাষ্ট্র হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিলেও আমার মনে হয় এখনও ঘানার সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে। তবে ফুটবল অনিশ্চয়তার খেলা। কোস্টারিকার উরুগুয়েকে হারিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আমরা সেই অনিশ্চয়তার প্রমাণও পেয়েছি। সুতরাং ঘানা ফেভারিট হলেও আমেরিকার পক্ষে অপ্রত্যাশিত কিছু করে ফেলাটা একেবারে অসম্ভব নয়।