মেসি যাদুতে জিতল আর্জেন্টিনা

ম্যাচটি আর্জেন্টিনা বনাম বসনিয়ার হলেও দর্শকদের চোখ ছিল শুধু মেসির উপর। মেসি কি করে তা দেখার জন্য নতুন মারাকানা স্টেডিয়ামে নেমেছিল দর্শকের ঢল। তাদের মেসি মেসি চিত্কারে কেঁপে ওঠে পুরো স্টেডিয়াম। আর দর্শকদের ভালোবাসার জবাবটাও মেসি দিয়েছেন দারুণভাবে। গোল করিয়ে এবং নিজে গোল করে ম্যাচ জিতিয়েছেন। আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে বসনিয়া হার্জেগোভিনাকে হারিয়ে ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলে সূচনা করেছে। আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষরা যে নিজের সন্তানের চাইতেও মেসিকে বেশি ভালবাসেন সেটি আবারও বোঝা গেল। হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পরিবার নিয়ে রিওতে আসেন প্রায় ৫০ হাজার আর্জেন্টাইন। পিঠে মেসি লেখা আকাশি জার্সি পড়ে দর্শকরা মারাকানার স্টেডিয়ামকে নীল রংয়ে ঢেকে ফেলেন। অবশ্য তাদের এই হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে খেলা দেখতে আসাটা বিফলে যায়নি। জাদুকর মেসি ঠিকই তাদের ভালোবাসার প্রতিদান দিলেন। আর্জেন্টাইনরা মনে করেন দলে মেসি একাই একশ’। পুরো দল খারাপ খেললেও মেসি কিভাবে আর্জেন্টিনাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পরে তা ফুটবল দুনিয়া দেখে নিল। তাই ম্যাচ সেরা পুরস্কারও পেলেন মেসি। ম্যাচটা শুরু হওয়ার আগে টিভি স্ক্রিনে ভেসে উঠে হ্যাপি বার্থ ডে মারাকানা স্টেডিয়াম। মাঠের নতুন জন্মদিনে মেসি আর্জেন্টিনাকে দারুণ একটা জয় উপহার দিয়েছেন। বল পায়ে মাত্র ৪০ সেকেন্ডের জাদুতে মুগ্ধ দর্শকরা। মাঝ মাঠ পার হয়ে বল নিয়ে দু্ তিনজনকে কাটিয়ে মাটিতে শুয়ে বাম পায়ের পাওয়ার ফুল শট গোলকিপার আসমির বেগোভিককে ফাঁকি দিয়ে পোস্টের গোড়ায় লেগে জালে ঢুকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মারাকানার দর্শকরা উঠে দাঁড়িয়ে মেসিকে সম্মান জানায়। ম্যাচের আগে সমর্থকরা ভেবেছিল ’৭৮ এবং ’৮৬ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চার গোল দেবে। অবশ্য সব ধারণা বদলে যায় খেলা শুরুর পরপরই। যারা আর্জেন্টিনার ফুটবলের টুকিটাকি খবর পর্যন্ত রাখেন তাদের কাছে এই ম্যাচের প্রথমার্ধটা ছিল বড় বেশি অচেনা। আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ভেরনও ম্যাচ দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন। খেলা শেষে তার সাথে কথা বলতে গেলে তিনি ম্যাচ প্রসঙ্গে বলেন, ‘খুবই খারাপ খেলেছে। আমাদের দল জিতেছে। খুশি হয়েছি। কিন্তু এই জয় বড়ই ঝুঁকিপূর্ণ।’ কফির মগে চুমুক দিয়ে আবার বললেন, ‘এভাবে খেললে সামনে বিপদ আছে।’ প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ বসনিয়া হার্জেগোভিনাকে যারা দুর্বল প্রতিপক্ষ মনে করেছিলেন তাদের মুখে ছাই দিয়েছেন বসনিয়ার খেলোয়াড়রা। ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলা স্ট্রাইকার এডিন, মাঝ মাঠের খেলোয়াড় রোমাতে খেলা মিরালেম, জার্মান লিগে খেলা এমিন, এমির, কোলাসানিকরা ম্যাচ হারলেও উপহার দিয়েছেন দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসী ফুটবল। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শুরুতে প্রতিরোধ গড়ে ক্রোয়েশিয়া পরে মিইয়ে গেলেও বসনিয়া তেমনটা করেনি। পুরো ৯০ মিনিট সমান তালে লড়েছে। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই আর্জেন্টিনার মতো বড় দলের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছে। তা নিয়েও তুমুল আলোচনা হয়েছে রিওতে। আর্জেন্টাইন সমর্থকরা নিজেদের দলের প্রশংসা করলেও বসনিয়া হার্জেগোভিনার প্রশংসাও করেছেন অকৃপণভাবে। গ্রুপে নিজেদের প্রতিপক্ষ ইরান এবং নাইজেরিয়ার জন্য হুমকি হয়ে থাকলো বসনিয়া। এতো সহজে যে তারা পার পাবে না সেকথা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়। দারুণ পরিকল্পিত ফুটবল খেলল দলটি। ছোট ছোট পাসে খেলে প্রতিপক্ষের ঘরে ঢুকে পড়ে। যদিও ভাগ্যটা খারাপ ওদের। ম্যাচ শুরুর ২ মিনিট ৮ সেকেন্ডে বিশ্বকাপ ফুটবলের সবচেয়ে দ্রুততম আত্মঘাতি গোলে পিছিয়ে যায় বসনিয়া। প্রথমার্ধে বাজে খেলা আর্জেন্টিনা ভাগ্যের উপর ভর করে এগিয়ে যায়। মেসির ফ্রি কিক মার্কোস রোজোর হেড বসনিয়ার ডিফেন্ডার কোলাসিনিকের হাঁটুতে লেগে নিজেদের জালে জড়ায়। অপ্রত্যাশিত ভাবে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ভালো না খেলেও আর্জেন্টিনার স্কোরবোর্ডের গায়ে ১-০ উঠে যায়। কিন্তু কোচ আন্দে স সাবেলা তাতে খুশি ছিলেন না। ডাগ আউটের সামনে তিনি ছটফট করছিলেন। বসনিয়া কয়েক বার আর্জেন্টিনার পোস্টে হানা দিয়ে গোলকিপার রোমেরুকে বিপদে ফেলে দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো, রোমেরু সজাগ ছিলেন। বিরতির পর সাবেলা ফরমেনশন পরিবর্তন করেন। ৩-৫-২ বদল করে ৪-৩-৩ পদ্ধতি শুরু করেন। মেসির সাথে হিগুয়েনকে ঠেলে দেন তিনি। আর তাতেই যেন সফল হলেন সাবেলা। মেসি হিগুয়েনের আক্রমণ যেন আরো বেড়ে গেলো। এতেও দমেনি বসনিয়া। মেসি, হিগুয়েন, মাসচেরানোর চোখ রাঙ্গানিতে একটুও ভয় পাননি বসনিয়ার মিরালেম, সেনেডা, বেসিকরা। তারা যেন আর্জেন্টিনার ক্ষেপে উঠার সাথে সাথে আরো জেগে উঠছিলেন। কিন্তু মেসিকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ৬৫ মিনিটে মেসি বল নিয়ে বসনিয়ার দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, মাটিতে শুয়ে দিয়ে বাঁ পায়ে দারুণ গোল করে দর্শক মন জয় করে নেন। যারা বলেন, মেসি ক্লাব ফুটবলের জন্য খেলে, দেশের জন্য নয় তাদের মুখে চুনকালি লেপে দিয়েছেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে খেলতে আসা এই গ্রহের সবচেয়ে প্রতিভাবান ফুটবলারটি। আর্জেন্টিনা ম্যাচ জয়ের পথে হাঁটছিল। কিন্তু ডিফেন্ডারদের দুর্বলতার সুযোগ ম্যাচের ৮৪ মিনিটে বসনিয়ার ইবিসেভিক দুর্দান্ত একটি শট করলে গোলকিপার রোমেরু আর ঠেকাতে পারেননি। তার পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে যায়। এবারের আসরসহ আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে ১১টি দলের বিরুদ্ধে ডেব্যু ম্যাচ খেললো। এর মধ্যে একটি ড্র ছাড়া বাকি ৯টিতে জিতলো আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যাচ ইরানের বিরুদ্ধে ২১ জুন। আর একই দিনে বসনিয়ার হার্জেগোভিনার ম্যাচ নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে।