বিহারী ক্যাম্পের পরিস্থিতি থমথমে, খুনিরা ধরা পড়েনি

রাজধানীর মিরপুরের বিহারী ক্যাম্প এলাকার পরিস্থিতি এখন থমথমে। গতকাল সোমবার নতুন করে মিছিল সমাবেশ না হলেও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা এবং মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এদিকে রিমান্ডে থাকা ৯ জনের কাছ থেকে কোন তথ্য বের করতে পারেনি পুলিশ। নতুন করে কাউকে গ্রেফতারও করতে পারেনি। ঘরে তালা দিয়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় খুনিদের এখন সনাক্ত বা গ্রেফতার কোনটাই করতে পারেনি পুলিশ। তবে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সৈয়দ জিয়াউজ্জামান বলেন, খুনিদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। পাশপাশি সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারেরও চেষ্টা চালানো হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি বিহারী ক্যাম্প এলাকার পরিস্থিতি। সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আগের মতোই বিপুল সংখ্যক পুলিশ ওই এলাকায় মোতায়েন রাখা হয়েছে। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের অনেকেই গতকাল অভিযোগ করেছেন, পুলিশ নিজেদের সুবিধামতো লোককে বাদী করে মামলায় ইচ্ছেমতো আসামিদের নাম বসিয়েছে। ক্যাম্পের বাসিন্দারা গতকাল বলেন, তাদের প্রধান দাবি, হত্যা-ভাংচুর-লুটপাটে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক। নিশ্চিত করা হোক তাদের নিরাপত্তা। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিও তুলেছেন কেউ কেউ। স্র্বান্ডেড পাকিস্তানিজ জেনারেল রিপ্যাট্রিয়েশন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুন্না হোসাইন বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে আমাদের অনেক অভিযোগ। এখন পুলিশই যদি মামলা তদন্ত করে তাহলে তা সুষ্ঠু হবে না। এ জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হোক। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালও এমন দাবি করেন। তিনি পুলিশের ব্যর্থতাকে দায়ী করে বলেন, সরকার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এ ঘটনার দায় এড়াতে পারেন না। স্থানীয় এমপি ইলিয়াস মোল্লাকেই এখন প্রমাণ করতে হবে তিনি এই ঘটনার সঙ্গে কোনভাবেই সম্পৃক্ত নন। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট সালমা আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, এ ঘটনায় দায়ী ও ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। গতকাল সকালে ক্ষতিগ্রস্ত বিহারী ক্যাম্প পরিদর্শনে গেছেন মার্কিন দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলে তাদের খোঁজ-খবর নেন। বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এক বিবৃতিতে বলেন, এ ঘটনার দায় স্থানীয় প্রশাসন, স্থানীয় এমপি ও সরকারকেই বহন করতে হবে। স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি মোবারক হোসেন বলেন, তিনি মসজিদে লুটপাটের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটির বাদী। তিনি বলেন, পুলিশ আমাদের মসজিদের ক্যাশিয়ার সরদারকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার করে। তাকে ছাড়ানোর ব্যাপারে কথা বললে পুলিশ আমাকে মামলা করতে বলে। আমি আপত্তি জানিয়ে বলি, এলাকার কোনো লোকের বিরুদ্ধে আমি মামলা করতে পারব না। পরে পুলিশের একজন এসে দু’টি কাগজে আমার স্ব্বাক্ষর নিয়ে যায়। তখনও বুঝতে পারিনি আমাকে মামলার বাদী করা হচ্ছে। কিন্তু আমি কোনো আসামির নাম পুলিশকে বলিনি। পল্লবী থানায় দায়ের করা তার মামলার এজাহারে আজাদ, আরিফ, জুয়েল, সাব্বির, নাসিম, সীমাসহ অজ্ঞাত পরিচয় ৮০০ থেকে ৯০০ জনকে আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি এদের কাউকেই চিনি না, বলতেও পারব না তারা দোষী কিনা। মামলায় তাদের নামও আমি দেইনি। পল্লবী থানার ওসি সৈয়দ জিয়াউজ্জামান বলেন, প্রত্যেক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা নিজেরাই বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আমরা তো কাউকে জোর করে মামলা করতে বলিনি। শুধু হত্যা ও পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দু’টি মামলা করেছে। পল্লবী থানায় দায়ের ছয়টি মামলা রবিবার রাতেই ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিবি) স্থানান্তর করা হয়েছে। ডিবির উপ-কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, গ্রেফতারকৃত ৯ জনকে আপাতত পল্লবী থানাতেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারা নিজেদের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করতে চাইছে না। তবে তাদের ঘটনাস্থল থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রয়োজনে তাদের আবার রিমান্ডে নেয়া হতে পারে। এখন পর্যন্ত হত্যাসহ অন্যান্য অপরাধে জড়িতদের কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। আজ মঙ্গলবার থেকে ডিবি পুরোদমে তদন্ত শুরু করবে বলেও জানান তিনি। অপরদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় বিহারীরা আবারো সড়ক অবরোধ করেছে। এ সময় কয়েকশ বিহারী রাস্তায় নেমে আসে। গতকাল দুপুরে তারা জেনেভা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকার গজনবী সড়ক অবরোধ করে রাখে। কালশি বিহারি ক্যাম্পে হতাহতের ঘটনায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লাকে গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছে জাতিসত্তা মুক্তি সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক প্রতিবাদ সভায় সংগঠনের অন্যতম নেতা মাইকেল চাকমাসহ অন্যরা এই দাবি জানান। নেতারা বলেন, কালশি বিহারী ক্যাম্পের হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সেখানকার এমপি ইলিয়াস মোল্লা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। অবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করতে হবে।