রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ছাত্রলীগের অবৈধ দখলে ১১ হলের ৩শ’ সিট!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থ ও তড়িত্ যন্ত্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মারুফুল ইসলাম। ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ৪১৭ নম্বর কক্ষ তার নামে বরাদ্দ দেয় হল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ওই কক্ষে গিয়ে তিনি কোনো সিট ফাঁকা পাননি। ফলে এক বছর অতিবাহিত হলেও তিনি হলে উঠতে পারেননি। কিন্তু ভর্তি হওয়ার কারণে হলে সিট না পেলেও তাকে এক বছর ধরে প্রতিমাসে সিট ভাড়া দিতে হচ্ছে। এ যন্ত্রণা শুধু মারুফুল ইসলামের একার নয়। তার মতো রাবির কয়েক হাজার সাধারণ শিক্ষার্থী হলে সিট পেলেও দখল পাচ্ছেন না। হলের সিট ভাড়া পরিশোধ করেও দুর্ভোগ স্বীকার করে তাদের বাইরের মেসে উচ্চ ভাড়ায় অবস্থান করতে হচ্ছে। অর্থাত্ তাদেরকে দুই জায়গায় সিট ভাড়া দিতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে বৈধভাবে আবাসিক হলে সিট বরাদ্দ হলেও সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি আবাসিক হলের ৫ হাজার সিটের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অন্তত ৩০০ সিট অবৈধভাবে নিজেদের দখলে রেখেছেন বলে জানা গেছে। অথচ অন্যের সিট অবৈধভাবে দখলে রাখায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা সিট ভাড়া বাবদ প্রতিমাসে অন্তত ৩০ হাজার টাকা প্রশাসনকে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে বরাদ্দের সময় প্রশাসন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের চাহিদা মতো সিট বরাদ্দ দিতেও বাধ্য হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পাস সূত্রগুলো জানায়, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি সিট নিজেদের দখলে রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে। এই হলে চার সিটের অন্তত ১১টি কক্ষ তারা অবৈধভাবে নিজেদের দখলে রেখেছেন। এরমধ্যে ২১৬, ২২১, ২২২, ২২৫, ২২৬, ২২৭, ২২৮, ২২৯, ২৩২, ৩১৩ ও ৩১৬ নম্বর কক্ষসহ আরও কয়েকটি কক্ষ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শের-ই-বাংলা ফজলুল হক হলে ছাত্রলীগের অবৈধ দখলে রয়েছে অন্তত ৪০টি সিট। এই হলে এক সিটের ৯টি কক্ষ যথাক্রমে-৫, ৭, ২০০, ৩০১, ৩০২, ৩০৩, ৩০৪, ৩০৫, ৩০৬ ছাড়াও চার সিটের আরো ৭টি কক্ষ যথাক্রমে ৮, ৯, ২১২, ২১৩, ২১৪, ২১৫, ২১৬ ছাত্রলীগের অবৈধ দখলে রয়েছে। শাহ্ মখদুম (এসএম) হলের অন্তত ৩৫টি সিট ছাত্রলীগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। হলের তিন সিটের ১১টি কক্ষসহ আরো একটি কক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো-২০১, ২০২, ২০৪, ২০৭, ২০৯, ২৫৪, ২৫৫, ২৬৫, ২৬৭, ২৫৮ ও ২৬০। আমীর আলী হলে তিন সিটের ৮টি কক্ষ ছাত্রলীগের অবৈধ দখলে রয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো হলো-২৫১, ২৫২, ২৫৩, ২৫৪, ২৫৫, ২৫৬, ২৫৭ ও ২৫৮। নবাব আব্দুল লতিফ হলের দুই সিটের ১০টি কক্ষ যথাক্রমে-২০২, ২০৪, ২০৬, ২০৮, ২১০, ২১২, ২১৪, ২১৬, ২০১৮ ও ২২০ তাদের অবৈধ দখলে রয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলের দুই সিটের ১১টি কক্ষ (২২০ থেকে ২৩০ পর্যন্ত ) ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া শহীদ হবিবুর রহমান হলের ২৫টি, মাদার বখশ হলের ২২টি, শহীদ শামসুজ্জোহা হলের ২০টি, শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ২০টি এবং মতিহার হলের অন্তত ১০টি সিট ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু প্রতিমাসে ওইসব সিটের ভাড়া দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত সিটগুলোতে যারা: ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে থাকা সিটগুলোতে বর্তমানে ছাত্রলীগের বেশকিছু বহিরাগতসহ একাধিক নেতাকর্মী থাকছেন। তারা হল প্রশাসন থেকে কোনো প্রকার সিট বরাদ্দ না নিয়েই অবৈধভাবে হলে থাকছেন। এছাড়াও ছাত্রলীগের সিটগুলোতে একাধিক শিক্ষার্থীকে তাদের দলে কাজ করার কথা বলে অবৈধভাবে হলে রাখা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন হলের অবৈধভাবে দখলে রাখা কক্ষগুলো বেশিরভাগ সময় তালাবদ্ধ অবস্থায় দেখা যায়। অসহায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা: বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন জানান, এ বছরের শুরুর দিকে জিয়াউর রমান হলে ভর্তির পর তাকে ১১৮ নম্বর কক্ষে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই কক্ষে গিয়ে কোনো সিট ফাঁকা না পাওয়ায় আর হলে থাকার সুযোগ পাননি। কিন্তু হলে না থাকলেও তাকে নিয়মিত হলের সিট ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে। নূর হোসেন সরকার নামের আরেক শিক্ষার্থী জানান, তার এক বন্ধু শাহ মখদুম হলে ভর্তি হলেও তাকে কোনো কক্ষ নম্বর দেয়া হয়নি। সে অনেক খুঁজেও কোনো কক্ষ না পেয়ে বিষয়টি হল প্রাধ্যক্ষকে বলেন। কিন্তু তিনি একাধিকবার আশ্বাস দেয়ার পরও হলে তার সিট পাননি। এভাবেই অনেক শিক্ষার্থী হলে সিট না পাওয়ার বিষয়ে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। আবার অনেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের যে কক্ষে সিট বরাদ্দ দেয়া হয়, সেখানে গিয়ে শুনেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আগেই গিয়ে ওই কক্ষের অন্য বাসিন্দাদের বলে এসেছে ফাঁকা সিটে যেনো তারা কাউকে না উঠায়। সেখানে তাদের পরিচিত ছেলে তোলা হবে। অভিযোগ রয়েছে, টাকার মাধ্যমে হলে সিট না হলেও ছাত্রলীগ অনেককে হলে জায়গা করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য: এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ চায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা যাতে হলে ভালোভাবে থাকতে পারে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদেরও বৈধভাবেই হলে থাকা দরকার। তবে তিনি বিপুল পরিমাণ সিট নিজেদের দখলে রাখার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। এ সমস্যা থেকে কিভাবে উত্তরণ সম্ভব? এ প্রশ্নের উত্তরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কাউন্সিলের আহ্বায়ক ও শাহ মখদুম হল প্রাধ্যক্ষ ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এই নিয়মটি অনেক আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসছে। হলের কক্ষগুলোকে উদ্ধার করার জন্য সকল হল প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক সাথে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, এতো পরিমাণ সিট কোনো ছাত্রসংগঠনের দখলে রয়েছে-তা আমার জানা নেই। আগে কখনো শুনিওনি। যদি তারা অবৈধভাবে সেখানে থেকে থাকে, তবে এর বিরুদ্ধে হল প্রশাসনকে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হবে বলে তিনি জানান ।