আঁধার ঘরে চাঁদের আলো
প্রকাশ : ১৬ জুন ২০১৪, ২২:২৬
পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে দিনমজুরি ও শ্রমিকের কাজ করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অনেকেই পেয়েছেন জিপিএ-৫। কিন্তু এ ভালো ফলাফলের পরও অনিশ্চিত ভবিষ্যত্ নিয়ে শঙ্কিত তারা। এসব মেধাবী মুখের খবর তুলে ধরেছেন আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
সৈয়দপুরের মেধাবী মুখ সুনিতা
ও রোজীর পড়াশুনা অনিশ্চিত
হতদরিদ্র দুই পরিবারের কন্যা সুনিতা ও রোজী। দিনমজুর পিতার অনিয়মিত আয়ে দু’বেলা আহার জুটতো না তাদের। তাই মায়ের সাথে চরকিতে সুতা গুছিয়ে ও সেলাইয়ের কাজ করে কোনরকমে জীবন নির্বাহ করতো। আর এর মাঝে পড়ালেখা চালিয়ে দুই মেধাবী কন্যা নীলফামারীর সৈয়দপুর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে পেয়েছে জিপিএ-৫। এতে শিক্ষকসহ বাবা-মার মনে আনন্দের বন্যা বইলেও তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ নিয়ে শংকিত তারা। মেধাবী রোজী জানায়, ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার নয়, আমি অনাহারি মা-বাবাকে সুখ দেয়ার জন্য পড়তে চাই। কিন্তু আমাকে কে পড়াবে? কে খরচ যোগাবে? রোজীর সহপাঠি সুনিতা ডাক্তার হতে চাইলেও তার বাবা-মার পক্ষে আর্থিক সংকুলান সম্ভব নয় বলে জানান এ মেধাবী শিক্ষার্থী।
রায়গঞ্জের অদম্য মেধাবী তানিয়ার
দায়িত্ব কে নেবে
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের অদম্য মেধাবী তানিয়া এবার দাখিল পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে। অসুস্থ পিতা আবু তাহের মানসিক ভারসাম্য-হীন। মা নিলুফা ইয়াসমিন ৫ বছরের শিশু কন্যাকে ছেড়ে অন্যত্র ঘর বেঁধেছেন ১০ বছর আগে। কখনো দাদা-নানার বাড়ি; কখনো প্রতিবেশীর খণ্ডকালীন খয়রাতি পরিচর্যায় বড় হয়ে উঠেছে তানিয়া খাতুন। তবু প্রাথমিক বৃত্তি লাভ, জেডিসিতে ভালো রেজাল্ট আর ধানঘরা মহিলা দাখিল মাদ্রাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে দাখিলে এ+ অর্জন সবই তার প্রচেষ্টার ফল। কিন্তু এখন একটাই প্রশ্ন কে নেবে দায়িত্ব তার।
দিনমজুরের কাজ করে লেখাপড়া
চালিয়েছে বাকি বিল্লাহ
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বড়দেহা গ্রামের বাকি বিল্লাহ দিনমজুরের কাজ করে নগর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাকি বিল্লাহর দিনমজুর বাবা মো. বুজরতি মেহেরের বাড়ি ভিটা ছাড়া কোন জমি-জমা নেই। বয়স আর অসুস্থতার জন্য তিনি কোন কাজ করতে পারেন না। তাই লেখাপড়া আর সংসার চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে বাকি বিল্লাহ। যেদিন রেজাল্ট প্রকাশ হয়, সেদিনও সে অন্যের জমিতে কাজে ব্যস্ত ছিল।
দেবীগঞ্জে গৃহপরিচারিকার মেয়ে
শাহানাজের গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন
পঞ্চগড়ের দেবী-গঞ্জের তাঁতীপাড়া লক্ষ্মীরহাট গ্রামের শ্যালো ম্যাকানিক সুরজ আলী ও গৃহপরিচারিকা নাছিমা আক্তারের দ্বিতীয় মেয়ে শাহানাজ পারভীন পেয়েছে গোল্ডেন এ প্ল¬াস। কৃতিত্বের সাথে পাস করলেও অর্থাভাবে এই মেধাবী ছাত্রী ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারছে না। শাহানাজ পারভীন ভবিষ্যতে চিকিত্সক হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
বাপ্পী রাজের স্বপ্ন পূরণে
বড় বাধা দরিদ্রতা
পাবনার চাটমোহর উপজেলার কুমার-গাড়া গ্রামের দিনমজুর (আইসক্রিম বিক্রেতা) মোঃ ইব্রাহিম হোসেনের ছেলে বাপ্পী রাজ এবারের এসএসসি (ভোক) পরীক্ষায় চাটমোহর টেকনিক্যাল এন্ড বিএমআই থেকে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে। পিতার সহায় সম্বল বলতে কিছু নেই। সারাদিন বরফ বিক্রি করে যা আয় হয় তা দিয়ে কোনরকম সংসার চলে। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে বাপ্পীকেও দিনমজুরি করতে হয়। ভবিষ্যতে সে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। কিন্তু দারিদ্র্যই তার স্বপ্ন পূরণের একমাত্র বাধা।
নাজমুলের ডাক্তার হওয়ার
স্বপ্ন পূরণ হবে কি?
বাবা দিনমজুর। মা ঝিয়ের কাজ করেন। নিজের বাড়ি করার জায়গা পর্যন্ত নেই। কুপির আলোয় পড়ালেখা করে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ+ (গোল্ডেন) পেয়েছে নাজমুল হুদা। তাছাড়া পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল। ভবিষ্যতে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে নাটোরের গুরুদাসপুরের মেধাবী ছাত্র নাজমুল। কিন্তু পরিবারের পক্ষে সেই স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হচ্ছে না।
কুষ্টিয়ায় হতদরিদ্রের ছেলে অমিয়
পেয়েছে গোল্ডেন জিপিএ-৫
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার শ্যামপুর গ্রামের হতদরিদ্র কৃষিজীবী শুম্ভুচন্দ্র মণ্ডলের একমাত্র ছেলে অমিয় মণ্ডল উপজেলার শিমুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। সংসারের শত অভাব অনটন আর আর্থিক সংকটও তার সাফল্য অর্জনে বাধা হতে পারেনি। সে ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হয়ে দেশের উন্নয়নে আত্মোত্সর্গ করতে চায়।